তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের মুনাফায় ধস

কর-রাজস্বে মারাত্মক ঘাটতি চাপ

Printed Edition

শাহ আলম নূর

দেশের তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো চলতি অর্থবছরে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় গভীর সঙ্কটে পড়েছে। উচ্চ ব্যাংক সুদহার, উৎপাদন ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি, ডলার দরের অস্বাভাবিক চাপ, আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির মতো একাধিক কারণ একসাথে আঘাত হানায় করপোরেট মুনাফা দ্রুত সঙ্কুুচিত হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সরকারের কর-রাজস্ব সংগ্রহে। বিশেষ করে বৃহৎ করদাতাদের (এলটিইউ) কাছ থেকে আদায়কৃত কর রাজস্বে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যা সামগ্রিক রাজস্ব কাঠামোকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ লার্জ ট্যাক্স পেয়ার ইউনিট) সূত্রে জানা যায়, কর আদায়ে তাদের ঘাটতি ক্রমেই বাড়ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ছয় হাজার ৬৫৮ কোটি টাকা, যা আগের বছরে ঘাটতি ছিল চার হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বৃহৎ করদাতা ইউনিটের রাজস্ব আদায় কমেছে ৩৮ শতাংশ। এ দিকে ২০২২-২৩ অর্থবছরে বৃহৎ করদাতা ইউনিটের রাজস্ব ঘাটতি ছিল তিন হাজার ১৪২ কোটি টাকা এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে তাদের রাজস্ব ঘাটতি ছিল তিন হাজার ৮২৩ কোটি টাকা। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০-২১ সালে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করতে পেরেছিল। এ সময় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১১৬ কোটি টাকা বেশি আদায় করেছিল। এমন পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, টানা চার বছর ধরে বড় করদাতাদের কাছ থেকে কর সংগ্রহে কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে না। এলটিইউ কর্মকর্তারা বলছেন, রাজস্ব টার্গেটে বড় ধরনের মিসম্যাচ রয়েছে। তাদের ভাষায়, এলটিইউয়ের রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা প্রায়ই ৩০ শতাংশের মতো থাকে, কিন্তু বাস্তবে গড় প্রবৃদ্ধি ১৫-১৬ শতাংশের বেশি হয় না।’ দেশের ব্যাংক, বীমা, মোবাইল অপারেটর, বড় শিল্পগোষ্ঠী এবং নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ মোট ২৮১টি প্রতিষ্ঠান এলটিইউয়ের আওতায় রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক চাপে এ প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা এতটাই কমে গেছে যে কর প্রদানের সক্ষমতা সঙ্কুুচিত হয়েছে। ফলে উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ তো দূরের কথা, গত কয়েক বছরের তুলনায় কর সংগ্রহও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে তালিকাভুক্ত বেশির ভাগ কোম্পানির মুনাফা প্রায় ২৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। মুনাফা কমে যাওয়ার পেছনে সমন্বিত একাধিক কারণ কাজ করছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, টাকার অবমূল্যায়নের প্রভাব, কাঁচামাল ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, সুদের হার বৃদ্ধি এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় বাজারে চাহিদা হ্রাস। এমনকি বহুজাতিক কোম্পানিগুলোও এ সঙ্কটের বাইরে নয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বছরওয়ারি মুনাফা কমেছে প্রায় ২৮ শতাংশ, যা সাম্প্রতিক সময়ে অন্যতম বড় পতন। করপোরেট খাতের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো জানায়, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কয়েক দফায় বেড়ে যাওয়া এবং সুদের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি মুনাফা কমার অন্যতম বড় কারণ। কয়েক বছর আগেও ব্যাংক ঋণের সুদহার ছিল ৯ শতাংশ। বর্তমানে তা ১২ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে অবস্থান করছে। ফলে নতুন ঋণ নেয়ার সক্ষমতা কমে গেছে, অনেক প্রতিষ্ঠান পুনঃতফসিল করতে বাধ্য হচ্ছে। বিনিয়োগের গতি প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে লাভের মার্জিন দ্রুত সঙ্কুুচিত হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সুদের এমন পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসা পরিকল্পনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

এ দিকে ডলার দরের অস্বাভাবিক চাপ পুরো ব্যবসা পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। তালিকাভুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান বলেন, ‘ডলার রেট এখন স্থিতিশীল হলেও যে পর্যায়ে স্থির হয়েছে, তা ব্যবসার জন্য অনেক বেশি। এই রেটে কাঁচামাল আমদানি করে আগের দামে পণ্য বিক্রি করা সম্ভব নয়। ফলে দাম বাড়াতে না পারায় কোম্পানিগুলো ক্রমেই মুনাফাহীন হয়ে পড়ছে।’ ডলারের দাম বাড়ায় শুধু আমদানি ব্যয়ই নয়, ঋণের বিপরীতে পরিশোধযোগ্য বিদেশী মুদ্রার দায়ও বেড়ে গেছে। এ দিকে দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে ফেলেছে। ফলস্বরূপ বাজারে চাহিদা কমেছে, বিক্রি কমে গেছে এবং তার প্রভাবে কোম্পানির রাজস্ব আয়ে ধস নেমেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক মন্থরতার কারণে ব্যবসার সার্বিক পরিবেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে, যার বহুমাত্রিক চাপ পড়েছে করপোরেট মুনাফার ওপর। মানুষ এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনাকাটায়ই সীমাবদ্ধ থাকছে। ইলেকট্রনিকস, সিমেন্ট, স্টিল, পোশাক, কসমেটিকস প্রায় সব সেক্টরেই বিক্রি কমে গেছে।

এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, কর কাঠামোতে অস্বাভাবিক বৈষম্য তৈরি হয়েছে। কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের ওপর কর নির্ভরতা এতটাই বেশি যে এদের মুনাফা কমে গেলে পুরো কর কাঠামোতে ঝুঁকি তৈরি হয়। কিন্তু বিপুলসংখ্যক মাঝারি ও ছোট প্রতিষ্ঠান কর নেটের বাইরে থেকে যাচ্ছে, যাদের অর্থনৈতিক অবদান বিবেচনায় নিলে রাজস্ব সংগ্রহ অনেক স্থিতিশীল হতে পারত। তার ভাষায়, ‘জনসংখ্যার শীর্ষ ১০ শতাংশ মানুষের কাছেই দেশের মোট সম্পদের ৫৮.৫ শতাংশ। কিন্তু কর আদায়ের ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রকৃতপক্ষে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও বহুজাতিক কোম্পানির ওপরই চাপ বেশি পড়ে। এ কাঠামো টেকসই নয়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, করপোরেট সেক্টরে চলমান মুনাফা সঙ্কোচন যদি অব্যাহত থাকে, তবে সরকারের সামনের দিনগুলো আরো কঠিন হতে পারে। রাজস্ব সংগ্রহ কমলে বাজেট পরিচালনায় চাপ বাড়বে, উন্নয়ন ব্যয় কমাতে হতে পারে, অভ্যন্তরীণ ঋণ বাড়াতে হতে পারে, যা আবার সুদ ব্যয় বাড়িয়ে অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করবে। এতে সরকারি খাতের বিনিয়োগ কমে যাবে, অবকাঠামো প্রকল্পের গতি মন্থর হবে এবং বেসরকারি খাতের ওপরও তার প্রভাব পড়বে। অন্য দিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, দ্রুত সুদহার কমানো, ডলার বাজারে স্থিতিশীলতা আনা, আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা এবং ভোক্তা আস্থা পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে করপোরেট সেক্টরকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। একই সাথে কর নেট সম্প্রসারণ, কর প্রশাসন শক্তিশালী করা এবং রাজস্ব কাঠামোর বৈষম্য কমাতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার জরুরি।