সীমান্তে অস্থিরতা বাড়াতে ভারতের পুশইন ছক

গত ২৪ দিনে প্রায় সব ক’টি সীমান্ত দিয়ে পর্যায়ক্রমে গতকাল পর্যন্ত পুশইন করেছে এক হাজার ২২২ জনকে। ভারত যাদের পুশইন করেছে তাদের ওপর নির্মম নিপীড়ন-নির্যাতন ও নিষ্ঠুরতার ছাপ ফুটে উঠেছে।

এস এম মিন্টু
Printed Edition
Kurigram-push-in
ভারতের পুশইনের পর কুড়িগ্রাম সীমান্তে আটক ব্যক্তিরা বিজিবি হেফাজতে | ফাইল ফটো
  • ২৪ দিনে বাংলাদেশে পুশইন ১২২২ জন
  • সরকার চাইলে সীমান্তে সেনাবাহিনী মোতায়েন

ভারত যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সীমান্ত দিয়ে জোরপূর্বক বাস্তচ্যুতদের পুশইন করে অস্থিরতার নতুন ছক তৈরি করছে বলে জানিয়েছেন বিশিষ্টজনরা। গত ২৪ দিনে প্রায় সব ক’টি সীমান্ত দিয়ে পর্যায়ক্রমে গতকাল পর্যন্ত পুশইন করেছে এক হাজার ২২২ জনকে। ভারত যাদের পুশইন করেছে তাদের ওপর নির্মম নিপীড়ন-নির্যাতন ও নিষ্ঠুরতার ছাপ ফুটে উঠেছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বারবার লিখিতভাবে তাগিদ দেয়া হলেও এ ব্যাপারে কোনো জবাব দিচ্ছে না ভারত। এমন কি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যরা ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) সাথে বারবার পতাকা বৈঠকে পুশইন বন্ধ করার তাগিদ দিলেও তারা কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো পুশইন করেই চলেছে। এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে ভারতের পুশইন ঠেকাতে দেশের সীমান্ত এলাকাগুলোতে সেনা মোতায়েন জরুরি। অপর দিকে সেনাবাহিনীর একাধিক সূত্র জানিয়েছে সরকার চাইলে দেশের স্বার্থে সেনা মোতায়েন করা হবে। তবে বিজিবি সেখানে ভালোভাবেই কাজ করছে বলে ওই সূত্র জানায়।

নিপীড়ন-নির্যাতনের বর্ণনা : ৪১ বছর বয়সী বাংলাদেশী মহিলা সেলিনা বেগম অভিযোগ করেছেন যে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) তাকে এবং তার তিন মেয়ের শরীরে গভীর রাতে খালি প্লাস্টিকের বোতল বেঁধে দেয়। এরপর ত্রিপুরার সাবরাং সীমান্তের কাছে ফেনী নদীতে তাদেরকে ফেলে দেয়। ফেনী নদী ত্রিপুরার সাবরাং জেলা ও বাংলাদেশের খাগড়াছড়ির রামগড় থানার মাঝামাঝি সীমান্ত নির্দেশনা দেয়। বিএসএফ পুশইন করার পর ফেনী নদীতে তারা সারারাত ভেসেছিলেন। পরদিন সকালে বাংলাদেশের সীমান্তের বাসিন্দারা তাদেরকে উদ্ধার করে। সেলিনা বেগম বলেন, তারা আমাদের কোমরে প্লাস্টিকের খালি বোতল বেঁধে নদীতে ফেলে দেয়। আমার সন্তানরা বুঝতে পারেনি কী হচ্ছে। আমরা সারা রাত নদীতে ভেসে ছিলাম।

বিজিবি সূত্র জানায়, গত ২২ মে ভোর ৬টার দিকে রামগড়ের সোনাইপুল এলাকার কাছে স্থানীয়রা সেলিনা, তার স্বামী উম্মেদ আলী (৪৭) এবং মেয়ে রুমি খাতুন (১৬), রুম্পা খাতুন (১৫) এবং সুমাইয়াকে (৬) ফেনী নদী থেকে উদ্ধার করে। পরে মহামুনি ক্যাম্প থেকে বিজিবির সদস্যরা তাদের উদ্ধার করে হেফাজতে নেন। পরিবারটি জানিয়েছে যে, তারা ভারতের হরিয়ানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করছিল। হরিয়ানার স্থানীয় পুলিশ যখন তাদেরকে আটক করে তখন তাদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়। তাদের জমানো টাকা (রুপি) কেড়ে নেয়া হয়। অনেকটা অভুক্ত অবস্থায় তাদেরকে একটা ট্রেনে তোলা হয়। কয়েক দফা ট্রেন পরিবর্তন করার পর তাদেরকে আনা হয় ত্রিপুরা রাজ্যে। সেখান থেকে গাড়িতে করে সাবরাং জেলা শহরের সীমান্তবর্তী বিএসএফের একটি ক্যাম্পে আনা হয়। এরপর তাদের প্রত্যেকের শরীরে খালি প্লাস্টিকের বোতল বেঁধে দেয়া হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পঞ্চাষোর্ধ আরেক নারী জানান, তিনি গত ১০ বছর ধরে ভারতে বসবাস করছেন। ১০ মে তাকে এবং তার স্বামীকে পুলিশ আটক করে ৪৬ জনসহ দিল্লির একটি পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যায়। তিন দিন ধরে তাদেরকে খাবার দেয়া হয়নি। শুধু পানি দেয়া হয়। এরপর তাদেরকে একটি বাসে তোলা হয়। তিন-চার দিন ধরে বাস চলার পর তাদেরকে বাংলাদেশের সীমান্তের পাশে বিএসএফের একটি ক্যাম্পে জড়ো করে। এরপর তাদেরকে ভোররাত ৩টার দিকে বাংলাদেশের দিকে পুশইন করা হয়।

এই দুই নারীসহ যাদের ভারত থেকে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে তাদের প্রত্যেকের অবস্থাই অত্যন্ত করুন।

এসব বিষয় নিয়ে বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বলেন, পতাকা বৈঠক এবং কূটনৈতিক মাধ্যমে বারবার প্রতিবাদ জানানো সত্ত্বেও বিএসএফ এবং ভারতীয় অন্যান্য সংস্থাগুলোর পুশইনের ঘটনা অব্যাহত থাকা দুঃখজনক।

তিনি বলেন, বিজিবি উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে এবং সংবেদনশীল সীমান্ত এলাকায় নজরদারি এবং টহল জোরদার করেছে। যাদের পুশইন করা হচ্ছে তাদের অনেকেই বাংলাদেশী নাগরিক যারা বছরের পর বছর ধরে ভারতে বসবাস করছিলেন। তাদের অনেকের সন্তান ভারতে জন্মগ্রহণ করেছে এবং তাদের কাছে ভারতীয় নথিপত্র ছিল। কিন্তু পুশইন করার আগে তাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক সমস্ত নথিপত্র কেড়ে নেয়া হয়েছিল।

তিনি আরো বলেন, এই ধরনের একতরফা পদক্ষেপ প্রতিষ্ঠিত প্রত্যাবাসন পদ্ধতি এবং দ্বিপক্ষীয় নিয়ম লঙ্ঘন করে। আন্তর্জাতিক মান অনুসারে এই বিষয়গুলো সমাধানের জন্য বিজিবি স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য প্রক্রিয়ার ওপর জোর দিচ্ছে।

বিজিবি প্রধান বলেন, ইউএনএইচসিআর (ভারত)-নিবন্ধিত ৫ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীকে গত ৭ মে জোরপূর্বক কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে পুশইন করা হয়। মানবিক মান বজায় রাখা এবং এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার জন্য তিনি প্রতিবেশী দেশের প্রতি আহ্বান জানান।

ভারতের পুশইন বিষয়ে সেনা সদর দফতরের এক সংবাদ সম্মেলনে নয়া দিগন্তের এক প্রশ্নের উত্তরে সেনাবাহিনীর মিলিটারি অপারেশনসের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: নাজিম-উদ-দৌলা বলেন, এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। গ্রহণযোগ্য নয়। বর্তমানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সীমান্তে বিষয়গুলো মোকাবেলা করছে। তবে যদি কোনো কারণে প্রয়োজন হয় বা সরকার আদেশ দিলে এ বিষয়ে সেনাবাহিনীও কাজ করবে। তবে বিষয়টি কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

এই বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্ট্যাডিজের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব:) আ ন ম মুনীরুজ্জামান নয়া দিগন্তকে বলেন, ভারত অবৈধভাবে পুশইন করছে বাংলাদেশে। তারা কাদেরকে পাঠাচ্ছে, কেনই বা পাঠাচ্ছে দুই দেশের সরকারের সাথে দেন দরবার না করে কেনইবা পাঠাচ্ছে সে বিষয়টি উদ্বেগের। এক দেশ থেকে আরেক দেশে লোক পাঠাতে হলে দুই দেশের মধ্যে সম্মতি থাকতে হয়। ভারত তার কোনো কিছুই মানছে না। তারা দুই দেশের যে আইন তা সম্পূর্ণভাবে লঙ্ঘন করেছে। মানবাধিকারও চরমভাবে লঙ্ঘন করেছে দেশটি। তিনি আরো বলেন, এক দেশের কোনো নাগরিক আরেক দেশে অবৈধ অনুপ্রবেশ করলে তাকে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও আন্তর্জাতিক আইনকানুন অনুসরণ করে ফেরত পাঠাতে হয়। কিন্তু ভারত যেভাবে কোনো ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে এই মানুষগুলোকে বাংলাদেশে পুশইন করল, তা সম্পূর্ণ বেআইনি, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক রীতিনীতির পরিপন্থী।

২৪ দিনে ভারতে থেকে পুশইন

বিজিবি সূত্র জানায়, গত ৭ মে থেকে গতকাল পর্যন্ত খাগড়াছড়ি সীমান্ত দিয়ে ১৩২ জন, সিলেট সীমান্ত দিয়ে ১১৫ জন, মৌলভীবাজার সীমান্ত দিয়ে ৩৮০ জন, হবিগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ৪১ জন, সুনামগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ১৬ জন, কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে ১৩ জন, ফেনী সীমান্ত দিয়ে ৫২ জন, কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে ৯৩ জন, লালমনিরহাট সীমান্ত দিয়ে ৮৫ জন, ঠাকুরগাঁও সীমান্ত দিয়ে ১৯ জন, পঞ্চগড় সীমান্ত দিয়ে ৩২ জন, দিনাজপুর সীমান্ত দিয়ে ১৫ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ১৭ জন, কুষ্টিয়া সীমান্ত দিয়ে ৯ জন, মেহেরপুর সীমান্ত দিয়ে ৩০ জন, চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে ১৯ জন, ঝিনাইদহ সীমান্ত দিয়ে ৫২ জন এবং সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে ২৩ জন। এ ছাড়া সুন্দরবনের গহিন অরণ্যের মান্দারবাড়িয়া এলাকায় ৭৮ জনকে পুশইন করা হয়েছে। গত ২৪ দিনে এক হাজার ২২২ জনকে পুশইন করেছে ভারত।

পুশইন রোধে বিজিবি কর্তৃক গৃহীত কার্যক্রমসমূহ

গতকাল বিজিবি সূত্র জানায়, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে পুশইন করায় বিএসএফের সাথে বিভিন্ন পর্যায়ে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে মৌখিক ও লিখিতভাবে জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছে বিজিবি। এছাড়া পুশইন রোধে বিজিবি সীমান্তে গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল তৎপরতা বৃদ্ধি করে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

দৌলতপুর সীমান্ত দিয়ে ৯ বাংলাদেশীকে পুশইন

দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) সংবাদদাতা জানায়, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্ত দিয়ে ৯ বাংলাদেশী নাগরিককে পুশইন করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ সদস্যরা। উপজেলার মহিষকুন্ডি এলাকা থেকে তাদের আটক করে প্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ শেষে শনিবার বিকেলে দৌলতপুর থানায় সৌপর্দ করেছে বিজিবি। তাদের বাড়ি কুড়িগ্রাম জেলায়। চার বছর আগে তারা কুড়িগ্রাম জেলার ভুরুঙ্গামারী থানার বামনহাট সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের মধ্যে চারজন পুরুষ, দুইজন নারী, দুইজন কিশোর ও একজন শিশু রয়েছেন। এ বিষয়ে বিজিবির পক্ষ থেকে শনিবার সকালে আনুষ্ঠানিক পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে বিএসএফকে পড়া প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। তবে বিএসএফ সদস্যরা পুশইন করার বিষয়ে তাদের জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে।

বিজিবি জানায়, উপজেলার ভাগজত খেয়াঘাট এলাকায় একটি নৌকা থেকে ৯ জন অপরিচিত মানুষকে নামতে দেখে স্থানীয় লোকজনের সন্দেহ হলে তারা বিষয়টি পার্শ¦বর্তী আশ্রয়ণ বিজিবি কোম্পানিকে খবর দেন। খবর পেয়ে বিজিবির নিয়মিত একটি টহল দল তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে পৌঁছে ওই ৯ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে বিজিবি হেফাজতে নেয়। বিএসএফ কর্তৃক কাঁটাতারবিহীন চরাঞ্চলীয় সীমান্ত দিয়ে রাত সাড়ে ১২টার দিকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানো হয়।

এ দিকে শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কুষ্টিয়া ব্যাটালিয়নের (৪৭ বিজিবি) অধীনস্থ চরচিলমারী কোম্পানি কমান্ডার ও ভারতের ১৪৬ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের জলঙ্গি কোম্পানি কমান্ডারের মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রচলিত আইনানুগ প্রক্রিয়ায় পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে হস্তান্তর না করে পুশইন করার বিষয়ে বিজিবি পক্ষ থেকে কড়া প্রতিবাদ জানানো হলে বিএসএফ এ ঘটনার সাথে জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করে। তবে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঘটলে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হস্তান্তর করা হবে বলে বিএসএফর পক্ষ থেকে বিজিবিকে জানানো হয়।

কুষ্টিয়া ব্যাটালিয়নের (৪৭ বিজিবি) অধিনায়ক লে. কর্নেল মাহবুব মুর্শেদ রহমান বলেন, এ বিষয়ে বিজিবির পক্ষ থেকে বিএসএফকে কড়া প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠকের প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে। আটকৃতদের পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য পুশইনকৃত সবাইকে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য শনিবার বিকেলে দৌলতপুর থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।