জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলো ২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস
কৈলাশটিলা-১ ও হবিগঞ্জ-৫ কূপ
Printed Edition
আবদুল কাদের তাপাদার সিলেট
সিলেট ও হবিগঞ্জের দু’টি কূপ থেকে ২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস নতুন করে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সিলেটের সম্ভাবনাময় গ্যাস ক্ষেত্র কৈলাশটিলার পুরনো ১ নম্বর কূপে সফল ওয়ার্কওভার শেষে জাতীয় গ্রিডে ৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস বৃহস্পতিবার রাত থেকে যুক্ত হয়েছে।
১ নম্বর কূপের পিডি মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম গতকাল শুক্রবার বেলা ৩টার দিকে নয়া দিগন্তকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, কূপটি থেকে গত ১৯ নভেম্বর ৫০ লাখ ঘনফুট গ্যাস প্রাপ্তির বিষয় নিশ্চিত হলেও যান্ত্রিক জটিলতা ও ভূমিকম্পজনিত সমস্যায় বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে কিছুটা সময় লাগে। অবশেষে বৃহস্পতিবার সফলভাবে ৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হয়।
এ দিকে হবিগঞ্জ গ্যাস ক্ষেত্রের পুরনো ৫ নম্বর কূপে সফল ওয়ার্কওভার শেষে অতিরিক্ত ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস বৃহস্পতিবার থেকে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। পেট্রোবাংলা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই কূপ থেকে নতুন ১৫ মিলিয়ন ঘনফুটসহ মোট ২৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলো।
এ ছাড়া কৈলাশটিলার নিকটবর্তী বিয়ানীবাজার গ্যাস ক্ষেত্রের পুরনো ২ নম্বর কূপে শুক্রবার ওয়ার্কওভার শুরু হয়েছে। এই কূপেরও পিডি শফিকুল ইসলাম। তিনি নয়া দিগন্তকে জানান, ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই কূপের ওয়ার্কওভার শুরু হয়েছে। এটিকে আমরা সম্ভাবনাময় মনে করছি।
কৈলাশটিলা ১ নম্বর কূপ : সিলেটের কৈলাশটিলা গ্যাস ফিল্ডের ১ নম্বর কূপে প্রায় ছয় বছর বন্ধ থাকার পর আবারো গ্যাসের সন্ধান মিলে। এই কূপে প্রতিদিন ৫০ লাখ ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা যাবে। কূপটিতে মজুদ আছে প্রায় ২০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। বড় ধরনের কোনো ত্রুটি না হলে আগামী ১০ বছর এই কূপ থেকে তিন হাজার কোটি টাকার বেশি মূল্যমানের গ্যাস উত্তোলন সম্ভব। ১৯ নভেম্বর প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ১ নম্বর কূপের তথ্য জানিয়েছিলেন সিলেট গ্যাস ফিল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল জলিল প্রামাণিক।
কর্মকর্তারা জানান, ১৯৬১ সালে খনন করা হয় কৈলাশটিলার এই কূপটি। খননের পর ছয়টি স্তরে গ্যাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ১৯৮৩ সালে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়। সর্বশেষ চতুর্থ স্তর থেকে ওয়ার্কওভারের সময় ২০১৯ সালে কূপটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। ছয় বছর বন্ধ থাকার পর ১ নম্বর কূপে আবার গ্যাস মজুদের প্রমাণ পাওয়া যায়।
নতুন স্তরে মজুদ প্রায় ২০ বিলিয়ন ঘনফুট। এখান থেকে প্রতিদিন জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে ৫০-৬০ লাখ ঘনফুট গ্যাস। ১০ বছর পর্যন্ত উত্তোলনের সম্ভাবনা আছে এই কূপে। এই কূপের গ্যাসে এলএনজি আমদানির হিসেবে সাশ্রয় হবে প্রায় তিন হাজার ৩০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০২৩ সালে সরকার পুরনো কূপগুলো আবার ওয়ার্কওভারের সিদ্ধান্ত নেয়। সিলেট গ্যাস ফিল্ডের অন্যান্য প্রকল্পের পাশাপাশি কৈলাশটিলাসহ তিনটি কূপের জন্য ২২০ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। গত ১২ আগস্ট বাপেক্স এই কূপের ওয়ার্কওভার কাজ শুরু করে। প্রায় তিন মাস কাজ শেষে ১২ নভেম্বর প্রাথমিক পরীক্ষা চালানো হয়।
১৯ নভেম্বর সন্ধ্যায় আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয় সিলেট গ্যাস ফিল্ড কর্তৃপক্ষ। ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, দুই হাজার ২০০ মিটার গভীরে কূপটিতে নতুন একটি স্তর পাওয়া গেছে- যেখান থেকে আগে কখনো গ্যাস উত্তোলন হয়নি। তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী সেখানে প্রায় ২০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুদ রয়েছে। তিনি আরো বলেন, কূপে বর্তমান চাপ অনুযায়ী প্রতিদিন ৫০-৬০ লাখ ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে দেয়া সম্ভব। এই হারে উত্তোলন হলে আগামী ১০ বছর গ্যাস পাওয়া যাবে। মজুদ গ্যাসের আনুমানিক মূল্য জানতে চাইলে তিনি জানান, বর্তমানে যে দামে বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানি করা হয়, সেই হিসাবে প্রায় তিন হাজার ৩০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।
হবিগঞ্জ ৫ নম্বর কূপ : হবিগঞ্জ গ্যাস ফিল্ডের ৫ নম্বর কূপের ওয়ার্কওভার শেষে দৈনিক অতিরিক্ত প্রায় ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। ফলে কূপটি থেকে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ মিলিয়ন ঘনফুটে। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) কর্তৃপক্ষ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
এর আগে গত বুধবার হবিগঞ্জের শাহজিবাজার এলাকায় গ্যাস উত্তোলন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো: রেজানুর রহমান। এ সময় বিজিএফসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: ফারুক হোসেনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বিজিএফসিএল সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, হবিগঞ্জ-৫ কূপটি ১৯৮৮ সালে তিন হাজার ৫২১ মিটার গভীরতায় খনন করা হয়েছিল। ওয়ার্কওভারের আগে কূপটি এক হাজার ৫২১ পিএসআই চাপে দৈনিক ১৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করছিল।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) বিজয়-১১ রিগ ব্যবহার করে ওয়ার্কওভার কার্যক্রম সম্পন্ন করে। ২৪ অক্টোবর ওয়ার্কওভার কাজ শুরু হয়ে ২ ডিসেম্বর শেষ হয়। এতে উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে। পেট্রোবাংলার অধীনে বিজিএফসিএল তিতাস, হবিগঞ্জ, বাখরাবাদ ও মেঘনা ফিল্ডে সাতটি কূপ ওয়ার্কওভার প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করছে।