বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নীতিমালা
খেলাপি ঋণ আংশিক অবলোপনের সুযোগ
ব্যাংকিং খাতের সম্পদমান বাস্তবায়নে নতুন দিগন্ত
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘ দিন ধরে অনাদায়ী ও মন্দ ঋণের চাপে জর্জরিত। বিশেষত ক্ষতিকর ঋণের একটি বড় অংশ আর্থিকভাবে পুনরুদ্ধারযোগ্য না হলেও ব্যাংকগুলো বিদ্যমান নীতিমালার অভাবে সেগুলোকে আংশিকভাবে অবলোপন করতে পারছিল না। এর ফলে ব্যাংকের স্থিতিপত্র অপ্রয়োজনীয়ভাবে ভারী হয়ে উঠছিল এবং সম্পদের প্রকৃত মান নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ছিল। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ আংশিক অবলোপন নীতিমালা চালু করেছে, যা ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নতুন নীতিমালা জারি করা হয়েছে।
পূর্ববর্তী নীতিমালার সীমাবদ্ধতা : গত বছর বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ (বিআরপিডি) থেকে ব্যাংকগুলোকে ঋণ অবলোপনসংক্রান্ত একটি বিশেষ ইউনিট গঠন এবং অবলোপন-পরবর্তী আদায় কার্যক্রম জোরদার করার নির্দেশনা দেয়া হয়। তবে আলোচ্য সার্কুলারের অনুচ্ছেদ ৩(৪)-এ স্পষ্টভাবে বলা ছিল, যেকোনো ঋণ আংশিকভাবে অবলোপন করা যাবে না। অর্থাৎ, শুধু সম্পূর্ণ অবলোপনই অনুমোদনযোগ্য।
বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, মন্দ ও ক্ষতিকর ঋণের একটি অংশ জামানত দ্বারা আচ্ছাদিত হওয়ায় আদায়ের সম্ভাবনা যথেষ্ট থাকে, আর অন্য অংশটি আদায়যোগ্য নয়। কিন্তু আংশিক অবলোপন নিষিদ্ধ থাকায় ব্যাংকগুলো এমন ঋণগুলোকে অবলোপন করতে পারছিল না। অন্য দিকে পূর্ণ অবলোপনের জন্য যে পরিমাণ প্রভিশন বা সংস্থান প্রয়োজন, তা সংগ্রহের সামর্থ্য অনেক ব্যাংকের নেই। ফলে হাজার হাজার কোটি টাকা ক্ষতিগ্রস্ত ও অনাদায়ী ঋণ ব্যাংকগুলোর স্থিতিপত্রে বহু বছর ধরে অকারণে প্রদর্শিত হচ্ছিল। এ অবস্থায় ব্যালান্সশিটের আকার স্ফীত হচ্ছিল, সম্পদের গুণগতমান প্রতিফলিত হচ্ছিল না এবং আন্তর্জাতিক রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড মানা সম্ভব হচ্ছিল না।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও প্রেক্ষাপট : ব্যাসেল নীতিমালা এবং আন্তর্জাতিক হিসাবমান আইএফআরএস-এর দৃষ্টিতে আংশিক অবলোপন একটি স্বীকৃত পদ্ধতি। আন্তর্জাতিকভাবে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ভারত, সিঙ্গাপুর এবং ইউরোপের অধিকাংশ দেশে দীর্ঘ দিন ধরে মন্দ ঋণের একটি অংশ অবলোপন করে বাকি অংশ আদায়ের উদ্যোগ নেয়া প্রচলিত। ফলে বাংলাদেশে এ ধরনের নীতি অনুপস্থিত থাকায় ব্যাংকিং খাত ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছিল।
নতুন নীতিমালার মূল বৈশিষ্ট্য : নতুন নীতিমালায় মূল বৈশিষ্ট হলো, আংশিক অবলোপনের সুযোগ। এতে মন্দ ও ক্ষতিকর হিসেবে শ্রেণিকৃত এবং যার সম্পূর্ণ আদায়ের সম্ভাবনা নেই- এমন ঋণ আংশিকভাবে অবলোপন করা যাবে। দ্বিতীয় হলো জামানতের বাজারমূল্য পুনর্মূল্যায়ন। এতে ব্যাংক চাইলে পেশাদার মূল্যায়নকারী দ্বারা বা নিজস্ব পদ্ধতিতে জামানতের বাজারমূল্য পুনর্নির্ধারণ করতে পারবে। এ মূল্যায়নই নির্ধারণ করবে কতটুকু ঋণ অবলোপনের আওতায় পড়বে। তৃতীয় হলো সুদের অংশ আগে অবলোপন। এতে অবলোপনের ক্ষেত্রে প্রথমে আরোপিত সুদের অংশ বাদ দিতে হবে। এরপর প্রয়োজন হলে আসল ঋণের অংশ অবলোপনযোগ্য হবে। চতুর্থ হলো, অনারোপিত সুদ পৃথক হিসাবায়ন। ঋণ অবলোপনের তারিখ পর্যন্ত জমাকৃত সব অনারোপিত সুদ পৃথকভাবে এবং আনুপাতিক হারে হিসাবায়ন করতে হবে। পঞ্চম হলো, আদায়কৃত অর্থের সমন্বয় প্রক্রিয়া। এতে ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে কোনো অর্থ আদায় হলে তা প্রথমে অবলোপনকৃত অংশের বিপরীতে সমন্বয় করা হবে। উদ্বৃত্ত থাকলে স্থিতিপত্রে প্রদর্শিত বকেয়া ঋণ কমানো হবে। ষষ্ট হলো, পুনঃতফসিল ও এক্সিট সুবিধা। এর মাধ্যমে অবলোপন-পরবর্তী অবশিষ্ট অংশ আদায়ের সুবিধার্থে পুনঃতফসিল বা এক্সিট স্কিমের সুযোগ রাখা হয়েছে।
নীতিমালার সম্ভাব্য প্রভাব
১. ব্যালান্সশিটের বাস্তবসম্মত প্রতিফলন : অকারণে প্রদর্শিত বিপুল পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত ঋণ বাদ পড়ায় ব্যাংকের স্থিতিপত্র প্রকৃত অবস্থাকে প্রতিফলিত করবে, যা বিনিয়োগকারী, নিয়ন্ত্রক ও অংশীজনদের কাছে ব্যাংকের আর্থিক শক্তিমত্তা পরিষ্কারভাবে তুলে ধরবে।
২. সম্পদমান উন্নয়ন : আংশিক অবলোপনের ফলে খারাপ মানের ঋণগুলোর অনাবশ্যক বোঝা কমবে, সম্পদমান উন্নত হবে।
৩. প্রভিশনের চাপ হ্রাস : পূর্ণ অবলোপনের জন্য বাধ্যতামূলক প্রভিশন সংরক্ষণ করতে না পারা ব্যাংকগুলো এখন আংশিক অবলোপনের মাধ্যমে ঝুঁকি কমাতে পারবে।
৪. ঋণ আদায় প্রক্রিয়ায় গতি : অবলোপনকৃত অংশ বাদ দেয়ায় ব্যাংকগুলো অবশিষ্ট অংশ আদায়ে আরো মনোযোগী হতে পারবে, যা সার্বিক ঋণ পুনরুদ্ধারকে ত্বরান্বিত করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন আংশিক অবলোপন নীতিমালা ব্যাংকগুলোর সম্পদ ব্যবস্থাপনায় একটি আধুনিক, বাস্তবসম্মত এবং কার্যকর দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করবে। এ উদ্যোগ ব্যাংকগুলোর স্থিতিপত্রকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করার পাশাপাশি ঋণ আদায়ে গতিশীলতা, সম্পদমান উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্য আনবে। দীর্ঘ দিন ধরে অনাদায়ী থাকা লাখ লাখ টাকার ক্ষতিগ্রস্ত ঋণ ব্যবস্থাপনায় এই নীতিমালা একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।