কুষ্টিয়ায় ৬ হত্যা মামলার সাক্ষী রাইসুল
হামলায় সরাসরি নির্দেশ দেন ইনু
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
- মানবতাবিরোধী অপরাধ
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি, সাবেক সংসদ সদস্য হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে। গতকাল সোমবার ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারিক প্যানেলে প্রথম দিনেই চাঞ্চল্যকর জবানবন্দী দিয়েছেন আন্দোলনে অংশ নেয়া মেহেরপুর জেলার মো: রাইসুল হক।
ট্রাইব্যুনাল-২-এর জেলা ও দায়রা জজ মো: মঞ্জুরুল বাছিদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে সাক্ষ্য দেন মো: রাইসুল হক (২৬)। তার জবানবন্দী অনুযায়ী, তিনি ঘটনার সময় কুষ্টিয়ার কালীশংকরপুর এলাকায় একটি মেসে থাকতেন এবং কোটা আন্দোলনকারীদের ওপর শেখ হাসিনার মন্তব্যের পর ১৪ জুলাই রাত ১১টার দিকে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের আশপাশে বিক্ষোভে অংশ নেন।
আন্দোলনের প্রথম দিকে ১৮ জুলাই রাইসুল হক গুরুতর আহত হন। তিনি বলেন, ডিসি কোর্টের সামনের মোড়ে ৩০০-৪০০ জন আন্দোলনকারী একত্রিত হলে ডিবি পুলিশ, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের হামলার শিকার হন। ছত্রভঙ্গ হওয়ার পর তারা আবার একত্রিত হয়ে আন্দোলন শুরু করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। সাক্ষী রাইসুল হক জানান, ‘তখন আমার কপালের ঠিক মাঝখানে শর্টগানের গুলি লাগে।’ আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসা একটি বাক্য ‘ভাই আমার লাশ যেন বিজয় মিছিলে যায়, লাশ যেন দাফন না করা হয়’ সেই সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারিত হয়েছিল।
রাইসুল হক তার জবানবন্দিতে সরাসরি জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর দিকে অভিযোগের আঙুল তোলেন। তিনি উল্লেখ করেন, ৪ আগস্ট ২০২৪ তারিখে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালের সামনে থেকে মজমপুরের দিকে চার-পাঁচ হাজার ছাত্র-জনতার মিছিল যায়। এ সময় আন্দোলনকারীরা আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাধার সম্মুখীন হন। তিনি দাবি করেন, ওইদিন আমাদের ওপর ছাত্রলীগ, যুবলীগের সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। এ হামলায় সরাসরি নির্দেশ ও উসকানি দিয়েছেন কুষ্টিয়া-২ আসনের এমপি, জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু। এ সময় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, কুষ্টিয়া সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতাসহ আওয়ামী লীগের নেতারাও হামলার উসকানি দেন।
সাক্ষী ৫ আগস্টের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির বর্ণনা দিতে গিয়ে কুষ্টিয়ায় ছয়জন নিহতের মর্মান্তিক ঘটনার কথা জানান। এ দিন প্রায় পাঁচ হাজার ছাত্র-জনতার মিছিলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে এবং আওয়ামী লীগের ‘সন্ত্রাসী বাহিনী’ হামলা করে। রাইসুল হক জানান, দুপুরের পর বক চত্বরের পাশে তাদের এক আন্দোলনকারীর ভাই, বাবু গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন এবং হাসপাতালে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। ‘ওইদিনই বক চত্বরের আশপাশে আমাদের আরো কয়েকজন, সুরুজ আলী বাবু, বাবুল ফরাজী, আবদুল্লাহ মুস্তাকিন, উসামাসহ মোট ছয়জন শহীদ হন।’ সাক্ষী আরো দাবি করেন যে, ৫ আগস্টের পরে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখতে পান, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন কলের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের দমনের জন্য বিভিন্ন পরামর্শ দেন। রাইসুল জবানবন্দীতে উল্লেখ করেন, প্রয়োজনে আন্দোলনকারীদের গুলি করা, বোম্বিং করা, যেকোন মূল্যে আন্দোলন দমন করার পরামর্শ ও উসকানি দেন ইনু।
সাক্ষী রাইসুল হক তার জবানবন্দীর শেষে হাসানুল হক ইনুর সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘জুলাই ২০২৪ আন্দোলনে কুষ্টিয়াতে ছাত্র-জনতার ওপর হামলা এবং আমাদের শহীদ ভাইদের ওপর হামলার প্রত্যক্ষ নির্দেশদাতা ও উসকানিদাতা হিসেবে হাসানুল হক ইনুর সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছি।’
প্রথম দিনের সাক্ষ্যগ্রহণে রাইসুল হক ছাড়াও প্রসিকিউশন টিমের সদস্য তানভীর হাসান জোহা সাক্ষ্য দিয়েছেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য সদস্য ছিলেন জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
এর আগে গত ২ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল-২ জাসদের এই সভাপতির বিরুদ্ধে আনা আটটি অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন। এ ছাড়াও সূচনা বক্তব্য ও সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য করেন। ওইদিন আটটি অভিযোগই ইনুকে পড়ে শোনান বিচারক। একপর্যায়ে নিজেকে পুরোপুরি নির্দোষ দাবি করেন হাসানুল হক ইনু।
তারো আগে গত ২৫ সেপ্টেম্বর হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে জুলাই-আগস্টে গণহত্যায় সহযোগিতাসহ সুনির্দিষ্ট আটটি অভিযোগ এনে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। সবশেষ গত ২৩ অক্টোবর ইনুর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের ওপর শুনানি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। শুনানিতে আটটি অভিযোগ উপস্থাপন করা হয়। পরে শুনানি শেষে অভিযোগ আমলে নিয়ে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট জারি করেন আদালত।
অন্য দিকে আলোচিত এ মামলায় গত ২৮ অক্টোবর ইনুর পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী। শুনানিতে কোনো অভিযোগ সত্য নয় জানিয়ে সেদিন ইনুর অব্যাহতির আবেদন করেন তিনি। তবে ১৪ দলীয় জোটের শরিক নেতা হিসেবে কোনো দায় ইনু এড়াতে পারেন না বলে জানায় প্রসিকিউশন।
গত বছরের ২৬ আগস্ট রাজধানীর উত্তরা থেকে হাসানুল হক ইনুকে গ্রেফতার করে পুলিশ। বর্তমানে বিভিন্ন মামলায় কারাগারে রয়েছেন তিনি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন এই জাসদ নেতা। তবে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে জোটের প্রার্থী হিসেবে কুষ্টিয়ায় নিজ আসনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে হেরে যান তিনি।
জুলাই-আগস্ট আন্দোলন ঘিরে কুষ্টিয়া শহরে শহীদ হন শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ। এ ছাড়াও আহত হন বহু নিরীহ মানুষ। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইনুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়। পরে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা। যাচাই-বাছাই শেষে উসকানি, ষড়যন্ত্রসহ সুনির্দিষ্ট আটটি অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন। তার বিরুদ্ধে দেয়া ফরমাল চার্জটি ৩৯ পৃষ্ঠা সংবলিত। আর মামলায় সাক্ষী করা হয়েছে ২০ জনকে। এ ছাড়াও নথি হিসেবে তিনটি অডিও ও ছয়টি ভিডিও দিয়েছে প্রসিকিউশন।