নির্বাচনের পূর্বাভাস : নতুন এক জরিপে জামায়াত এগিয়ে

বাংলাদেশের নির্বাচনে তুমুল লড়াই ও ফলে অনিশ্চয়তা

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগে প্রকাশিত সমীক্ষা ও জনমত জরিপগুলো এ কথা পরিষ্কার করে তুলেছে যে এবারের নির্বাচনে রাজনৈতিক সমীকরণটা আগের যেকোনো নির্বাচন থেকে বেশি ঘনিষ্ঠ ও অনিশ্চিত। ভারতের ইকোনমিক টাইমসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়।

নামচেনা আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় জরিপ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন সম্প্রতি প্রকাশিত জরিপে দেখা যাচ্ছে, বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোট ও জামায়াত-নেতৃত্বাধীন শিবিরের মধ্যে সমর্থনের পার্থক্য প্রায় নগণ্য- মাত্র ০.২ শতাংশ। অনেক ক্ষেত্রে সমান সমর্থন বা খুব কাছাকাছি ফলাফল উঠে এসেছে। একভাবে বলা যায়, ‘এবারের নির্বাচন ফলাফল কী হতে পারে?’- সেই প্রশ্নের উত্তরটিই এখন সম্ভাবনার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে।

জরিপগুলোর মূল দিকগুলো

ক্স বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোট ও জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোট সমর্থনে প্রায় সমান এবং সময় ভেদে শক্তির অঙ্কের পার্থক্য প্রতি জরিপে বদলাচ্ছে।

ক্স একাধিক জরিপেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটার এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি- অনির্ধারিত ভোটের হার উল্লেখযোগ্য।

ক্স তরুণ ভোটার ও প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া অংশের মধ্যে ভোটের দিক নির্ধারণে গতিশীলতা দেখা যাচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই অনিশ্চয়তার পেছনে বড় কারণ হলো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, অর্থনৈতিক ইস্যু ও তরুণ ভোটারের মনোভাবের দ্রুত পরিবর্তন। বিশেষ করে বর্তমান নির্বাচনে তরুণ ভোটারের অংশগ্রহণ ও সমর্থনের ক্ষেত্রে গতির পরিবর্তন বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

আওয়ামী লীগের প্রভাব কম : ঐতিহ্যবাহী ভোট ব্যাংকগুলোতে আওয়ামী লীগের সমর্থন অনেক জরিপেই কম পরিমাণে দেখা গেছে। তাদের সমর্থক স্বতন্ত্রের পরিবর্তে লড়াই প্রধানত বিএনপি এবং জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে- যা এই নির্বাচনের রাজনৈতিক আবহ সমাজের অনেক স্তরে নতুন প্রশ্ন তুলছে।

পর্যবেক্ষকরা উল্লেখ করছেন যে এই ধরনের ঘনিষ্ঠ নির্বাচনী লড়াই- যেখানে কোনো দল বা জোট এককভাবে প্রাধান্য পায়নি- তা গণতান্ত্রিক খেলা ও ভোটারদের সিদ্ধান্তের গুরুত্বকেই সামনে টেনে ধরে। আগামী ভোটের দিন যখন সামনে আসবে, অনির্ধারিত ভোটের পরিমাণ কতটা কমে বা বাড়ে তা হবে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণে সবচেয়ে বড় প্রভাবক।

এ নির্বাচন একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে- ভোটাররা সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে মূল্যায়ন করছেন রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, প্রতিপক্ষের সক্ষমতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা। আর এ কারণেই কোনো দলই এখন সহজে জয়ী বলেই চিহ্নিত হচ্ছে না।

নতুন এক মাঠ সমীক্ষায় এগিয়ে জামায়াত, কাছাকাছি বিএনপি

১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন জোর প্রস্তুতি, তখন মাঠপর্যায়ের এক বিস্তৃত সমীক্ষা নতুন এক ভোট-সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। শহর, গ্রাম, গঞ্জ, পাহাড় ও সমতলের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার আনুমানিক তিন লাখ মানুষের সাথে সরাসরি আলোচনা ও মতামত সংগ্রহের ভিত্তিতে পরিচালিত এই সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে- এবারের নির্বাচন মূলত বিএনপি জোট ও জামায়াত জোটের দ্বিমুখী লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

সমীক্ষার সার্বিক চিত্র বলছে, ৩০০ আসনের মধ্যে জামায়াত জোট ১৬২ আসনে এগিয়ে, বিএনপি জোট ১২২ এবং স্বতন্ত্র ও অন্যান্য প্রার্থী ১৬ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। অর্থাৎ জামায়াত জোট একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার সীমা (১৫১) অতিক্রম করতে পারে- এমন সম্ভাবনার কথাই উঠে এসেছে মাঠপর্যায়ের তথ্য থেকে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, চূড়ান্ত ফল নির্ভর করবে স্থানীয় প্রার্থী, জোট সমন্বয় ও শেষ মুহূর্তের ভোটার আচরণের ওপর।

ঢাকা বেল্ট : নগর ভোটে ইসলামী ঝোঁক: এ সমীক্ষা অনুসারে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ জেলার ৪১ আসনে সমীক্ষা বলছে- জামায়াত জোট ২২, বিএনপি ১৮ আসনে এগিয়ে। শিল্পাঞ্চল ও মধ্যবিত্ত অধ্যুষিত এলাকায় সরকারের প্রতি অসন্তোষ এবং সংগঠিত ভোটব্যাংকের কারণে জামায়াত এগিয়ে থাকলেও বিএনপি ঘাঁটিতেও শক্ত লড়াই হবে।

বরিশাল-ফরিদপুর : ঐতিহ্যগতভাবে বিএনপির দুর্গ : এখানকার ৩৬ আসনের এই অঞ্চলে বিএনপি ২২ আসনে লিডে, জামায়াত ১৩। স্থানীয় নেতৃত্ব ও পারিবারিক ভোটধারার কারণে বিএনপির প্রভাব এখনো দৃঢ়।

খুলনা-রাজশাহী-রংপুর : গ্রামীণ ভোটে জামায়াতের উত্থান : এই তিন বেল্ট মিলিয়ে ১০৮ আসনে জামায়াতের শক্ত অবস্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এখানে খুলনা : জামায়াত ২২; রাজশাহী : ২৩ এবং রংপুর : ২৫ আসন মিলিয়ে এ অঞ্চলে ইসলামপন্থী ভোটের কনসোলিডেশন স্পষ্ট। স্থানীয় তৃণমূল সংগঠন ও মসজিদভিত্তিক নেটওয়ার্ক তাদের বড় শক্তি হিসেবে কাজ করছে।

ময়মনসিংহ ও কুমিল্লা-নোয়াখালী : বিএনপির প্রত্যাবর্তন : এই দুই বেল্টে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী। ময়মনসিংহে বিএনপি ২৩ এবং কুমিল্লা-নোয়াখালীতে বিএনপি এগিয়ে। গ্রামীণ ভোট, স্থানীয় নেতৃত্ব এবং পুরনো দলীয় আনুগত্য এখানে বড় ফ্যাক্টর।

চট্টগ্রাম ও সিলেট : মিশ্র চিত্র : চট্টগ্রামে পাহাড়ি ও উপকূলীয় আসনে স্বতন্ত্র ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের ভূমিকা থাকলেও সমীক্ষা বলছে জামায়াত এগিয়ে। সিলেটে লড়াই প্রায় সমানে সমান- জামায়াত ১৬, বিএনপি ১৫।

বড় প্রবণতা কী বলছে?

সমীক্ষা বিশ্লেষণে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট : আওয়ামী লীগ কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে- দ্বিমেরু নির্বাচন: বিএনপি বনাম জামায়াত; তরুণ ভোটারদের মধ্যে ‘পরিবর্তন’-এর আকাক্সক্ষা তীব্র; গ্রামে ধর্মভিত্তিক সংগঠনের প্রভাব বৃদ্ধি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী কয়েকটি আসনে ‘কিংমেকার’ হতে পারেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘এবারের নির্বাচন আদর্শগত পুনর্বিন্যাসের নির্বাচন। ভোটাররা ঐতিহ্যগত দলীয় পরিচয়ের বাইরে বিকল্প খুঁজছে।’

সব মিলিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হতে যাচ্ছে হাড্ডাহাড্ডি ও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যদি সমীক্ষার ইঙ্গিত বাস্তবে রূপ নেয়, তবে জাতীয় রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।