আতঙ্ক ও বড় পতনের ধাক্কা সামলে নিলো পুঁজিবাজার
অনুমোদন পেল ২৫ কোটি টাকার মিউচুয়াল ফান্ড
Printed Edition
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট আতঙ্ক অনেকটা কাটিয়ে উঠেছে দেশের পুঁজিবাজার। সামলে নিয়েছে বড় পতনের ধাক্কাও। গতকাল বুধবারের পুঁজিবাজার আচরণ তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। এ দিন লেনদেনের শুরুতে দুই পুঁজিবাজার সূচকে প্রচণ্ড অস্থিরতা থাকলেও শেষদিকে এসে তার অনেকটাই কাটিয়ে ওঠে বাজারগুলো। এমনকি লেনদেনের মাঝামাঝি পর্যায়ে সূচকের বড় ধরনের উন্নতিও ঘটতে দেখা যায় যদিও দিনশেষে তা টিকে থাকেনি। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পুরোপুরি আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে একটু সময় লাগলেও বাজারে খুব বেশি দরপতনের আশঙ্কা আর নেই।
গতকাল সকালে লেনদেনের শুরুতে ব্যাপক অস্থির আচরণ ছিল পুঁজিবাজারের সূচকে। ঢাকায় দিনের শুরুতেই প্রধান সূচকটির ৫০ পয়েন্টের মতো হারায় ডিএসই; কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে বিক্রয়চাপ সামলেও নেয় বাজারটি। পরবর্তী পনের মিনিটে সূচকটির উন্নতি ঘটে প্রায় ৩১ পয়েন্ট। সকাল সাড়ে ১০টায় সূচকটি আবার ৩৩ পয়েন্টের মতো অবনতি ঘটে। আর এভাবে প্রথম আধঘণ্টা দুই বাজার সূচকের আচরণ ছিল প্রচন্ড অস্থিরতায় ভরা। তবে এর পরই অস্থিরতা কিছুটা কমে আসে। বেলা সোয়া ১১টার দিকে নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করে বাজার সূচক। এর এক ঘণ্টা পর সূচকটি পৌঁঁছে যায় দিনের সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৩৯০ পয়েন্টে। এ পর্যায়ে সূচকের ৬৩ পয়েন্ট উন্নতি রেকর্ড করা হয়। তবে শেষদিকে এসে সৃষ্ট বিক্রয়চাপ সূচকের এ উন্নতি ধরে রাখতে দেয়নি। তবে আগের দিনের ২০৮ দশমিক ৯৮ পয়েন্ট পতনের যে আতঙ্ক তা থেকে বেরিয়ে এসেছে বাজারটি।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ২ দশমিক ০৩ পয়েন্ট হ্রাস পায়। ৫ হাজার ৩২৫ দশমিক ০৬ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি বুধবার দিনশেষে নেমে আসে ৫ হাজার ৩২৩ দশমিক ০৩ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর অবনতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ৪ দমমিক ৭৪ ও দশমিক ৮৭ পয়েন্ট। অপর দিকে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ৭৭ দশমিক ৬৮ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। এখানে বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসইসএক্স সূচকের অবনতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ৫২ দশমিক ৫১ ও ৫৯ দশমিক ১৮ পয়েন্ট।
দিনভর অস্থির বাজার আচরণের কারণে গতকাল দুই পুঁজিবাজারেই লেনদেনের বড় ধরনের অবনতি ঘটে। ঢাকা শেয়ারবাজার গতকাল ৫৮২ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হয়, যা আগের দিন অপেক্ষা ৩০৩ কোটি টাকা কম। মঙ্গলবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৮৮৫ কোটি টাকা। অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টকে ২৩ কোটি টাকা থেকে আট কোটি টাকায় নেমে আসে লেনদেন।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, সংবেদনশীল হওয়ায় বড় ধরনের যুদ্ধাবস্থা সারা বিশ্বের পুঁজিবাজারের ওপর প্রভাব ফেলে। এবারো তার ব্যতিক্রম হয়নি। সারা বিশ্বের পুঁজিবাজারে ব্যাপকভাবে পতন ঘটে চলেছে; কিন্তু আমাদের পুঁজিবাজারের সাথে বহির্বিশে^র খুব একটা সম্পর্ক না থাকায় এখানে বড় ধরনের প্রভাব না পড়ারই কথা। কিন্তু ২০২২ সালের রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ছিল আমাদের পুঁজিবাজারেও। তবে সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি কোন দিকে যায় তার ওপরই বাজার অবস্থা নির্ভর করবে। কিন্তু এর মধ্যে পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে বিনিয়োগকারীদের। কথায় কথায় আতঙ্কিত হয়ে নিজেদের কষ্টার্জিত পুঁজি নিজেরা নষ্ট করা পরিপক্ব বিনিয়োগকারীর লক্ষণ নয়। তাই সবাইকে যৌক্তিক আচরণ করা উচিত।
এ দিকে পুঁজিবাজারে আরেকটি নতুন বিনিয়োগ পণ্য যুক্ত হতে যাচ্ছে। পুঁজিাবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ‘লংকা-বাংলা ফিক্সড ইনকাম ফান্ড’ নামে একটি বেমেয়াদি মিউচ্যুয়াল ফান্ডের খসড়া প্রসপেক্টাসে অনুমোদন দিয়েছে।
মঙ্গলবার বিএসইসি চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কমিশনের ১০০১তম সভায় এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কমিশনের পরিচালক ও মুখপাত্র মো: আবুল কালাম স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। সংস্থাটির প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, কমিশনের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে ফান্ডটির খসড়া প্রসপেক্টাস এবং এর সারসংক্ষেপ (অ্যাব্রিজড ভার্সন) পর্যালোচনা শেষে অনুমোদন দেয়া হয়।
ঘোষণা অনুযায়ী, ফান্ডটির প্রাথমিক আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান লংকা-বাংলা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড দুই কোটি ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছে। অবশিষ্ট ২২ কোটি ৫০ লাখ টাকা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। প্রতিটি ইউনিটের অভিহিত মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা।
ফান্ডটির সম্পদ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করবে লংকা-বাংলা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড। ট্রাস্টি হিসেবে দায়িত্বে থাকবে সন্ধানী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড (এসএলআইসি) এবং কাস্টডিয়ান হিসেবে কাজ করবে কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন পিএলসি।
দীর্ঘ দিন লেনদেনের শীর্ষে থাকা সিটি ব্যাংককে পেছনে ফেলে গতকাল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে ওষুধ ও রসায়ন খাতের ওরিয়ন ইনফিউশন। ৩৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ১০ লাখ ৫৭ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ৩২ কোটি ৩৬ লাখ টাকায় এক কোটি দুই লাখ ৯১ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে সিটি ব্যাংক ছিল দ্বিতীয় স্থানে। ডিএসই’র লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, ব্র্যাক ব্যাংক, সি পার্ল বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, রবি অজিয়াটা, ঢাকা ব্যাংক ও গ্রামীণফোন।
ডিএসইতে দিনের মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ কোম্পানি ছিল ভ্রমণ ও বিনোদন খাতের সি পার্ল বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা। কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ইনটেক অনলাইন। ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ওরিয়ন ইনফিউশন, দেশ গার্মেন্টস, পপুলার লাইফ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, একমি পেস্টিসাইডস, ফার্স্ট বাংলাদেশ ফিক্সড ইনকাম ফান্ড, এমএল ডাইং, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ ও শাইনপুকুর সিরামিকস।