‘ছেলের বুক থেকে বের করা হয়েছে ৭টি গুলি, শরীরে ছিল ৫৫টি ক্ষত’
শহীদ ওসমানের বাবার জবানবন্দী
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ওসমান পাটোয়ারীর বাবা ডা: মো: আব্দুর রহমানের জবানবন্দী দেয়ার সময় এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তিনি জানান, ময়নাতদন্তের সময় তার ছেলের নিথর দেহ থেকে ৭টি বুলেট বের করা হয়েছে এবং তার শরীরে ছিল মোট ৫৫টি গুলির চিহ্ন।
গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এই সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে ডা: মো: আব্দুর রহমান তার জবানবন্দীতে ৪ আগস্টের সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো: মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
সাক্ষ্য দিতে গিয়ে শহীদ ওসমানের বাবা বলেন, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট সকাল ৯টায় ওসমান আমাকে ফোন দিয়ে বলে ‘আব্বু, আমি আজ আন্দোলনে যাবো, আমার সাথে হয়তো তোমার আর দেখা হবে না, তুমি আমাকে মাফ করে দিও।’ আমি বারণ করেছিলাম, কিন্তু সে শোনেনি। পরে জানতে পারি, সে তার মায়ের দুই গালে ও কপালে চুমু খেয়ে বলেছিল ‘আম্মু, তুমি আমাকে আয়াতুল কুরসি পড়ে ফুঁ দিয়ে দাও, আল্লাহ যেন আজকে আমাকে শহীদ হিসেবে কবুল করেন।’
চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ওসমান ওইদিন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে লক্ষ্মীপুরে আন্দোলনে যোগ দেন। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন করে তার বাবাকে জানানো হয়, ওসমান লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে মারা গেছেন।
সন্তানের লাশ বাড়িতে নেয়ার পথে পৈশাচিক বাধার কথা উল্লেখ করে ডা: আব্দুর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা হাসপাতাল ঘেরাও করে রেখেছিল। অনেক কাকুতি-মিনতির পর অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া হলেও পথে পাঁচবার গাড়ি থামিয়ে লাশ কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করা হয়। পরে বিকল্প পথে লাশ বাড়িতে পৌঁছানো হয়। এমনকি ঢাকা থেকে রওনা হওয়ার সময় অ্যাম্বুলেন্স চালকও আওয়ামী লীগের ভয়ে তাকে নিতে অস্বীকার করেছিলেন বলে তিনি জানান।
জবানবন্দীতে তিনি সরাসরি অভিযুক্তদের নাম উল্লেখ করে বলেন, ‘লক্ষ্মীপুর পিংকি প্লাজার সামনে ওসমান গুলিবিদ্ধ হয়। আওয়ামী লীগ নেতা তাহেরের ছেলে সালাউদ্দিন টিপু ও তার সহযোগীরা ছাদ থেকে এবং নিচ থেকে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে আমার ছেলেসহ তিনজনকে হত্যা করে। টিপু, তার ভাই বিপ্লব, শাহীন ও শিবলুসহ স্থানীয় আওয়ামী ক্যাডাররা এই হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা।’ তিনি আরো অভিযোগ করেন, শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামালসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশে ও উসকানিতেই এই গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে।
দাফনের এক মাস এক দিন পর ময়নাতদন্তের জন্য ওসমানের লাশ তোলার অভিজ্ঞতায় সাক্ষী বলেন, ‘বন্যার কারণে পানির ওপর তাকে দাফন করেছিলাম। এক মাস পর কবর থেকে তোলার সময় দেখি লাশটি ঠিক যেমন রেখেছিলাম তেমনই আছে, কোনো পচন ধরেনি। উপস্থিত সবাই অবাক হয়ে বলেছিলেন শহীদের লাশ নষ্ট হয় না, আজ নিজ চোখে দেখলাম। (এ পর্যায়ে সাক্ষী কান্নায় ভেঙে পড়েন)।
সাক্ষ্য দেয়ার সময় ডা: আব্দুর রহমান তার মোবাইল ফোনে ওসমানের গাওয়া একটি গজল বাজিয়ে শোনান। শহীদ হওয়ার আগের দিন ভিডিও করা সেই গজলে ওসমান গেয়েছিলেন মৃত্যুর পর যেন তাকে ‘বড়ই পাতার গরম জলে’ গোসল করিয়ে সাজিয়ে দেয়া হয়। এই দৃশ্য দেখে এজলাসে উপস্থিত সবার চোখ ভিজে ওঠে।
মামলার আসামিরা হলেন ওবায়দুল কাদের, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ, মাইনুল হোসেন খান নিখিল, সাদ্দাম হোসেন ও শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। সকল আসামি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। জবানবন্দী শেষ করে ডা: আব্দুর রহমান খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সব হত্যার ন্যায়বিচার দাবি করেন।