ঋণ খারাপ হওয়ার আগেই প্রভিশন বাধ্যতামূলকে আপত্তি ব্যাংকমালিকদের
উৎসাহ বোনাসে চান শিথিলতা
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার করা এবং আন্তর্জাতিক মানের আর্থিক প্রতিবেদন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে ঋণ খারাপ হওয়ার আগেই সম্ভাব্য তির জন্য প্রভিশন সংরণ বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বেসরকারি ব্যাংকের উদ্যোক্তা ও পরিচালকরা। একই সাথে মূলধন বা প্রভিশন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকের কর্মকর্তাদের উৎসাহ বোনাস দেয়ার েেত্র বিদ্যমান কড়াকড়ি ব্যবস্থায় শিথিলতার দাবি জানিয়েছেন তারা। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সাথে প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকে এসব বিষয় তুলে ধরেছে বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যানদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)। বৈঠকে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন গভর্নর। বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা জানান, আলোচনায় ব্যাংকিং খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ, নিয়ন্ত্রক নীতিমালা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান বাস্তবায়নের বিষয়গুলো উঠে আসে। বিশেষ করে আইএফআরএস-৯ অনুযায়ী আগাম প্রভিশন সংরণের বিষয়টি নিয়ে বেশ আলোচনা হয়।
আইএফআরএস-৯ বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ
বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকিং খাতে ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান (আইএফআরএস-৯) বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এ ব্যবস্থায় ‘এক্সপেক্টেড ক্রেডিট লস’ বা সম্ভাব্য ঋণ তি বিবেচনায় রেখে ঋণ খারাপ হওয়ার আগেই ব্যাংকগুলোকে প্রভিশন সংরণ করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন এই পদ্ধতি ২০২৮ সাল থেকে কার্যকর হবে। তবে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর দাবি, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অবকাঠামো ও আর্থিক সমতার সাথে এটি বাস্তবায়ন করা বেশ কঠিন হবে। বিএবির প থেকে গভর্নরকে জানানো হয়, অনেক ব্যাংক ইতোমধ্যে মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতিতে রয়েছে। এমন অবস্থায় ঋণ খারাপ হওয়ার আগেই নতুন করে প্রভিশন সংরণের বাধ্যবাধকতা তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বৈঠকে উপস্থিত একজন চেয়ারম্যান বলেন, ‘ঋণ পুনঃতফসিলের েেত্র কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে দীর্ঘ সময়সীমা ও গ্রেস পিরিয়ড দিয়েছে। এরপরও যদি একই ঋণের বিপরীতে নতুন করে প্রভিশন রাখতে হয়, তাহলে অনেক ব্যাংকের জন্য তা বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়বে।’ তার মতে, আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে দেশের বাস্তবতা বিবেচনায় নীতিমালাগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
বোনাসে শিথিলতা চাইল ব্যাংকগুলো
গত বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক নির্দেশনায় বলা হয়, কোনো ব্যাংক যদি আর্থিক লোকসান বা মূলধন ঘাটতিতে থাকে, তবে তারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎসাহ বোনাস দিতে পারবে না। এই নির্দেশনা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিএবি। সংগঠনটির দাবি, সঙ্কটে থাকা ব্যাংকগুলোকে পুনরুদ্ধার করতে হলে কর্মকর্তাদের উৎসাহ ধরে রাখা জরুরি। তাই বোনাসসহ অন্যান্য সুবিধা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া হলে কর্মীদের মনোবল কমে যেতে পারে। বিএবির প্রতিনিধিরা বৈঠকে বলেন, প্রতিটি ব্যাংকের পরিস্থিতি ভিন্ন। তাই একই নিয়ম সব ব্যাংকের েেত্র সমানভাবে প্রয়োগ করলে অনেক েেত্র সমস্যা তৈরি হতে পারে। তারা প্রস্তাব দেন, মূলধন বা প্রভিশন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকের েেত্রও সীমিত আকারে হলেও কর্মকর্তাদের বোনাস দেয়ার সুযোগ রাখা উচিত। তাদের মতে, সঙ্কটাপন্ন ব্যাংককে ঘুরে দাঁড় করাতে দ জনবল ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান
বৈঠকে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং নিয়ন্ত্রক তদারকি আরো শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা বজায় রেখে ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। একই সাথে তিনি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন। বৈঠকে অংশ নেয়া একজন কর্মকর্তা জানান, গভর্নর ব্যাংকগুলোর মতামত গুরুত্ব দিয়ে শুনেছেন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের বিষয় নিয়ে নিয়মিত আলোচনার আশ্বাস দিয়েছেন।
স্বাধীন পরিচালক নিয়ে উদ্বেগ
বৈঠকে ব্যাংক কোম্পানি আইনে স্বাধীন পরিচালক নিয়োগ সংক্রান্ত সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে বিএবি। সংগঠনটির চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার বলেন, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনার আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সাথে আরো আলোচনা প্রয়োজন। তার মতে, বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে উদ্যোক্তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ব্যাংক পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই স্বাধীন পরিচালক নিয়োগের েেত্র মালিকানা ও পরিচালনা কাঠামোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। একজন চেয়ারম্যান জানান, এ বিষয়ে তারা ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে একটি চিঠিও দিয়েছেন, যেখানে আন্তর্জাতিক উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে।
নিয়মিত সংলাপের গুরুত্ব
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে বিএবি চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ ও আলোচনার মাধ্যমে নীতিগুলো আরো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব।’ তিনি আরো বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাথে দূরত্ব তৈরি হলে সঠিক নীতি প্রণয়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। আমরা দুর্বল ব্যাংকগুলোকে রা করার বিষয়েও আলোচনা করেছি।’
আইএফআরএস-৯ অনুযায়ী আগাম প্রভিশন সংরণ ব্যাংকের ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটি এখনো একটি নীতিগত নির্দেশনা মাত্র, যা ২০২৮ সাল থেকে কার্যকর হবে। তার ভাষায়, ‘আন্তর্জাতিকভাবে এই নীতি অনুসরণ করা হয়। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটি কিভাবে কার্যকর করা যায়, সেটিই এখন বড় বিষয়। কারণ আমাদের ব্যাংকিং অবকাঠামো অনেক দেশের মতো শক্তিশালী নয়।’ বিশ্লেষকদের মতে, আইএফআরএস- বাস্তবায়ন হলে ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নত হবে এবং আর্থিক প্রতিবেদন আরো স্বচ্ছ হবে। তবে একই সাথে এটি অনেক ব্যাংকের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে। ফলে নীতিমালা বাস্তবায়নের আগে বাস্তবতা বিবেচনায় ধাপে ধাপে এগোনোর প্রয়োজন রয়েছে।