এলোমেলো জীবন : ম স আলম

Printed Edition

বয়স তত বেশি না। তারা হয়তো ভার্সিটি পড়ুয়া। সবে প্রথম বা দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র-ছাত্রী হবে। দোয়েল চত্বরে রাস্তার পাশে ময়লার স্তূপের পাশে মাথাহীন দুটো লাশ। ভার্সিটির ছাত্র-ছাত্রীরা ইতোমধ্যে ভীড় জমাচ্ছে। ধীরে ধীরে বাড়ছে হইচই। পুলিশ হতভম্ব। তাদের চেহারায় ভয়ের ছাপ। লাশের পরিস্থিতি সামলাতে তাদের হিমশিমে পড়তে হবে। ঊর্ধ্বতন দফতর হতে বারবার ফোন আসছে। ভয়ে ভয়ে ফিসফিসিয়ে আলাপচারিতা চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশের সদস্যরা।

রিফাত ভয়ে ভয়ে রাস্তা পার হলো। সে সবে গ্রামের বাড়ি হতে ফিরলো। ছাত্রাবাসে প্রবেশের আগ মুহূর্তে যে পরিস্থিতি, তা বুঝতে পারলে, পূর্বেই যাত্রাবাড়ীতে অবস্থান নিতো। ছাত্রাবাসে আসতো না, মনে মনে বিড়বিড়িয়ে বললো। চুপি চুপি সে লাশের পাশ দিয়ে হেঁটে চলে গেল। নিজ রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ল। মানুষ নিজে মরে গিয়ে অন্যদের ফাঁসিয়ে দেয়ার মধ্যে যে রহস্য, তা অজানা। রিফাত চুপচাপ। শাওন ঘুম হতে জেগে রিফাতের বিছানার পাশে বসলো। বসে বলতে লাগল চুপচাপ শুয়ে রইলি, কোনো সমস্যা?

রিফাত- না, সমস্যা নেই। তবে বাহিরে গণ্ডগোল হতে পারে।

শাওন-গণ্ডগোল?

রিফাত- হ্যাঁ, গণ্ডগোল। ঘুমাতে দে, সারারাত ঘুমাইনি।

ইতোমধ্যে বাহিরে মিছিলের শব্দ শোনতে পাচ্ছে শাওন। শাওন জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। শতশত ছাত্র-ছাত্রী সব দৌড়ে গেটে যাচ্ছে। সবার হাতে বাঁশ, লাঠি-সোটা ইত্যাদি। সেøাগান দিচ্ছে জোরে জোরে। ভার্সিটি এলাকায় লাশের হেতু, জানতে চাই, জানতে চাই?

শাওন লাইট নিভিয়ে দিলো। সেও চুপচাপ হয়ে গেল। সেও নতুন, সবে প্রথম বর্ষের ছাত্র। বাহিরে গণ্ডগোলের আওয়াজ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। ছাত্রবাসের পুরাতন ছাত্ররা রুমে রুমে গিয়ে নতুন ছাত্রদের বাহিরে নিচ্ছে। মিছিলে অংশগ্রহণের জন্য শাওনের রুমের দরজা বেশ সময় নড়লো, তবুও শাওন চুপচাপ রইল।

লাশ দুটো চিহ্নিত হয়েছে। মেয়েটার নাম ফারিহা। সে ঢাকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পদার্থ বিজ্ঞানের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। অপর লাশের নাম রোহান। ফলিত পদার্থ বিজ্ঞানের ২য় বর্ষের ছাত্র। পুলিশ লাশ নিয়ে চলে গেল। লাশ নিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের মিছিল চলমান। হত্যার বিচার চাচ্ছে । লাশ নিয়ে যাওয়ার পর পুলিশের বড় অফিসারসহ ডিবির সদস্যরা জায়গাটি পরিদর্শন শেষে চলে গেল। প্রশাসন চুপচাপ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। সেøাগান ধীরে ধীরে আরো দুর্ভেদ্য হচ্ছে। পুরো দিনটি সেøাগানে শেষ হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, ছাত্রদের উদ্দেশ্যে তার অভিমত জানাল। ছাত্ররা যেন গণ্ডগোলে জড়িত না হয়, শান্ত রয়, পুলিশের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, বিষয়টি দ্রুত সম্ভব সমাধান হবে। হত্যার সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় নিবে। তবুও ছাত্ররা তাদের মিছিল ছাড়লো না, তারা তাদের সহপাঠীর হত্যার বিচার দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়টি নিশ্চিত চায়। ভিসি তার অভিমত জানিয়ে চলে গেল। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা শেষে রাত নেমে এলো। শান্তিপূর্ণভাবে ছাত্র-ছাত্রীদের অবরোধ শিথিল হলো।

রাত ২টা। পুলিশের জিপ হু হু সাইরেনে ছাত্রবাসের গেট দিয়ে সরাসরি শাওনের রুমে পৌঁছাল ও শাওনরে ধরে নিয়ে গেল। পুরো হলের ছাত্ররা নিশ্চুপ। ভিপি রিসাদ সরাসরি তাদের ভিসিরে ফোনে বিষয়টি জানাল। ভিসি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ দিলেন। বললেন, রাতে যেন গণ্ডগোল না হয়। ভোরে বিষয়টির সমাধান হবে। রিসাদ চুপ হয়ে গেল। সে তার রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ল। রিফাত বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভাবছে? দিনের শুরুতে ভিসি থানায় গিয়ে জানতে পারলো শাওন ফারিহা ও রোহান হত্যার সাথে জড়িত। বিষয়টি তদন্তের নিমিত্তে সন্দেহ বশত জিজ্ঞাসাবাদের জন্য শাওনরে ধরা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে যদি জড়িত না হয় তবে শাওনরে হলে দিয়ে আসা হবে।

দুই মাস পর পুলিশের জিপ ভিসির রুমের সামনে গিয়ে থামল। পুলিশ ভিসির রুমে গিয়ে জানাল, ফারিয়া রোহান ড্রাগস ব্যবসার সাথে জড়িত ছিল। ওই রাতে ড্রাগস পাচারের সময় দেনা-পাওনা নিয়ে ড্রাগস মাফিয়া রিভুর সাথে তাদের ঝগড়া হয়। রিভু, ফারিয়া ও রোহানের ওপর গুলি চালিয়েছে। শুধু গুলি নয় তারা ধারালো ছুরি দিয়ে গলাকেটে ফারিহা ও রোহানের মাথা হাতিরঝিলে পানির মধ্যে ফেলে দেয়।

যে স্বপ্ন মানুষরে মানুষ নয় জানোয়ার বানিয়ে দেয়, সে স্বপ্ন মানুষের ভেতরে জন্ম না নেয়াই মঙ্গল। রিফাত তার প্রিয় বন্ধুদের মধ্যে অন্যতম। ভার্টিসিতে সবচেয়ে বেশি আপন ছিল রিফাত। সে রিফাত ডাবল মার্ডারের আসামি। পালিয়ে বেড়াচ্ছে আজ।

জানি না তার পরিস্থিতি। বেঁচে রয়েছে, না সেও মৃত? শাওন রিফাতের বাড়িতে সন্ধান নিয়েছে, রিফাত বাড়িতে যায়নি। রিফাতের পিতা-মাতাও রিফাতের বিষয়ে তথ্য দেয়নি। শাওন ভার্টিসিটিতে পুরো নিঃস্ব ও নীরব হয়ে গেছে। শাওন চুপচাপ বসে রয়েছে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে। সামনে নারায়ণগঞ্জ পেছনে আহসান মঞ্জিল।