যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ারি দিলো ইরান
Printed Edition
এনবিসি ও বিবিসি
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যকে ‘বেপরোয়া ও বিপজ্জনক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। একই সাথে তিনি পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, কোনো হামলার ঘটনা ঘটলে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে এবং কোথায় আঘাত হানতে হবে তা তারা ভালোভাবেই জানে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রথমে ইরানি কর্তৃপক্ষকে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা না করার সতর্কবার্তা দেন। তিনি বলেন, ‘ওয়াশিংটন তাদের উদ্ধার করতে আসবে।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ‘আমরা লকড অ্যান্ড লোডেড, যেতে প্রস্তুত।’ এ দিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাকচি জানান, ইরানের সেনারা যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত। দেশটিতে এক সপ্তাহ ধরে চলা বিক্ষোভে শনিবার সকাল পর্যন্ত অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছে। ট্রাম্প শুক্রবার লিখেছেন, ‘ইরান যদি চিরাচরিত অভ্যাসের বশবর্তী হয়ে গুলি চালায় এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের সহিংসভাবে হত্যা করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের উদ্ধার করতে এগিয়ে আসবে।’ এ দিকে ওয়াশিংটন কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে, তা নির্দিষ্ট করে বলেননি।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল। বিপরীতে কাতারে অবস্থিত একটি মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা করে ইরান। এক্সে (টুইটার) দেয়া এক বিবৃতিতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি লেখেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করার আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পেরই জানা উচিত যে, জনসম্পত্তিতে অপরাধমূলক হামলা সহ্য করা যায় না।’ তিনি আরো বলেন, যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপ ‘দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করবে’ ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে।
ইরানে বিক্ষোভে নিহত বেড়ে ১০
এদিকে এপি জানায়, ইরানে দুর্বল অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে চলমান বিক্ষোভে সহিংসতা আরো বেড়েছে। গতকাল শনিবার দেশটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নতুন করে দুইজন নিহত হওয়ায় মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে অন্তত ১০ জনে। তারা জানায়, আন্দোলন থামার কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। এ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার ইরানকে সতর্ক করে বলেন, তেহরান যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসবে।
ট্রাম্প কিভাবে বা আদৌ হস্তক্ষেপ করবেন কি না তা স্পষ্ট না হলেও তার এ মন্তব্যের পরই ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার ভেতরে থাকা কর্মকর্তারা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান এবং মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সেনাদের লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দেন। গত এক সপ্তাহ ধরে চলা এ বিক্ষোভ ২০২২ সালের পর ইরানে সবচেয়ে বড় আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। ২০২২ সালে পুলিশ হেফাজতে ২২ বছর বয়সী মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। তবে বর্তমান আন্দোলন এখনো মাহসা আমিনির মৃত্যুকে ঘিরে হওয়া বিক্ষোভের মতো এতটা বিস্তৃত বা তীব্র হয়নি। মাহসা আমিনিকে কর্তৃপক্ষের পছন্দ অনুযায়ী হিজাব না পরার অভিযোগে আটক করা হয়েছিল। শনিবার ভোররাত পর্যন্ত সংঘটিত সহিংসতায় সহিংসতার মাত্রা আরো বেড়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত পত্রিকার খবরে বলা হয়, দেশটির গুরুত্বপূর্ণ শিয়া ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্রের শহর কুমে একটি গ্রেনেড বিস্ফোরণে এক ব্যক্তি নিহত হন। নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে পত্রিকাটি জানায়, নিহত ব্যক্তি শহরে হামলার উদ্দেশ্যে ওই গ্রেনেড বহন করছিলেন।
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারিতে জাতিসঙ্ঘের হস্তক্ষেপ চাইলো ইরান
জীবনযাত্রার ঊর্ধ্বমুখী ব্যয়ের প্রতিবাদে ইরানে চলা বিক্ষোভের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেয়া হুঁশিয়ারির প্রতিবাদে জাতিসঙ্ঘের হস্তক্ষেপ চেয়েছে তেহরান। স্থানীয় সময় শুক্রবার (২ জানুয়ারি) জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ও নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতিকে একটি চিঠি পাঠান জাতিসঙ্ঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাঈদ ইরাভানি।
তিনি চিঠিতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্যকে ‘উসকানিমূলক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন’ আখ্যা দিয়ে এসব মন্তব্যের কঠোর নিন্দা জানানোর আহ্বান জানান। গতকাল শুক্রবার ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল বলেছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ইরানে চলমান বিক্ষোভে যদি আরো কোনো বিক্ষোভকারী নিহত হন, তাহলে আমেরিকা প্রদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
চিঠিতে বলা হয়, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা উসকে দেয়া, উৎসাহিত করা কিংবা বৈধতা দেয়ার যেকোনো প্রচেষ্টা ইরানের সার্বভৌমত্ব, রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার গুরুতর লঙ্ঘন। তিনি সতর্ক করে দেন, এ ধরনের বক্তব্য থেকে সৃষ্ট যেকোনো পরিস্থিতির সম্পূর্ণ দায় যুক্তরাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে।
গত রোববার তেহরানের উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক স্থবিরতার প্রতিবাদে ধর্মঘটে নামার পর থেকেই দেশজুড়ে এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। এ পর্যন্ত অন্তত সাতজন নিহত এবং ৪৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কুম প্রদেশের উপ-গভর্নর জানান, বিক্ষোভ উসকে দেয়ার চেষ্টায় হাতে গ্রেনেড বিস্ফোরণে আরো একজনের মৃত্যু হয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলি লারিজানি ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, মার্কিন হস্তক্ষেপ পুরো অঞ্চলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ধ্বংসের শামিল হবে। উল্লেখ্য, গত জুনে ইসরায়েল-ইরান উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়, যাকে ট্রাম্প ‘খুব সফল অভিযান’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। সম্প্রতি ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দেন, ইরান পারমাণবিক বা ব্যালিস্টিক কর্মসূচি এগিয়ে নিলে যুক্তরাষ্ট্র ‘কঠোর জবাব’ দেবে।