রাজনৈতিক ময়দানে নানা সমীকরণ

নির্বাচনকে প্রভাবিত করছে সহিংসতা ও অনলাইন প্রচারণা

Printed Edition

মঈন উদ্দিন খান

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর এই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তুলনামূলকভাবে অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে এগিয়ে চলছে। আওয়ামী লীগ কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয়ে নির্বাচন থেকে বাদ পড়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা সমীকরণ গড়ে উঠেছে, যেখানে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা দেখা যাচ্ছে। নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনের সাথে জুলাই চার্টার নিয়ে গণভোটও যুক্ত, যা দেশের ভবিষ্যৎ সংবিধান ও শাসনব্যবস্থার দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন, প্রার্থী প্রায় এক হাজার ৯৮১ জন।

বিশ্লেষকরা এই নির্বাচনকে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার একটি যুগান্তকারী পরীক্ষা হিসেবে অভিহিত করছেন, যেখানে কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার, তরুণ প্রজন্মের কণ্ঠস্বর এবং দুর্নীতিমুক্ত, অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীল একটি দেশগঠনের সুযোগ রয়েছে। এই ভোটের ফলাফল শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ভারসাম্যই নয়, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও ভবিষ্যৎ পথও নির্ধারণ করবে বলে অনেকে মনে করছেন

পটভূমি ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি : ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটায়। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম সন্ত্রাসবাদবিরোধী আইনে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সৃষ্ট আবেগ এবং তারেক রহমানের দেশে ফিরে আসা বিএনপিকে নতুন গতি দিয়েছে। টাইম ম্যাগাজিন তারেক রহমানকে ‘স্পষ্ট ফ্রন্টরানার’ বলে উল্লেখ করেছে। প্রচারণা শুরু হয়েছে গত ২২ জানুয়ারি থেকে, কিন্তু রাজনৈতিক সহিংসতা উদ্বেগজনক। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর থেকে ১৬ জন রাজনৈতিক কর্মী খুন হয়েছেন, যাদের ১৩ জন বিএনপির। সংঘর্ষের ঘটনা ৬২টির বেশি, অস্ত্র উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। ভোটাররা নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত।

নির্বাচনী মাঠে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট এবং জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোটের মধ্যে। ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি-এনসিপি ৩২ আসনে লড়ছে জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোটবদ্ধ হয়ে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জাতীয় পার্টিও নির্বাচনে প্রার্থী দিয়েছে।

ভোটার প্রবণতা ও জরিপের চিত্র : বিভিন্ন জরিপে বিএনপি এগিয়ে থাকলেও জামায়াতে ইসলামীর উত্থান লক্ষণীয়। অন্য এক জরিপে বিএনপি ৩৪.৭ শতাংশ, জামায়াত ৩৩.৬ শতাংশ ভোট পাবে বলে দেখানো হয়েছে। অনেক জরিপে অনিশ্চিত ভোটার ১৭-৪৮ শতাংশ। একটি সার্ভে (জানুয়ারি ২০২৬) অনুসারে ৭০ শতাংশ ভোটার বিএনপিকে সমর্থন করেন, ১৯ শতাংশ জামায়াতকে। তরুণ ভোটাররা (১৮-৩৭ বছর, মোট ভোটারের ৪৪ শতাংশ) এই নির্বাচনের গেম চেঞ্জার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।

তরুণ সমাজের ভোটের ট্রেন্ড : বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টারর ‘ইয়ুথ ম্যাটার্স সার্ভে ২০২৫’ (অক্টোবর ২০২৫, ১৮-৩৫ বছর বয়সী ২৫৪৫ জন উত্তরদাতা) অনুসারে, ৯৭ শতাংশ তরুণ ভোট দিতে চান, কিন্তু ৩০ শতাংশ অনিশ্চিত। দলীয় সমর্থন: বিএনপি ২০ শতাংশ, জামায়াত ১৭ শতাংশ, আওয়ামী লীগ ৯.৫ শতাংশ, এনসিপি ৩.৬ শতাংশ। ৬৭ শতাংশ তরুণ দুর্নীতি নির্মূলকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন, তারপর বেকারত্ব (৫৬ শতাংশ), আইনশৃঙ্খলা ও নারীর নিরাপত্তা। ৭৬ শতাংশ মনে করেন নারীরা নিরাপদ নন। ১৮.৩ শতাংশ স্থায়ীভাবে বিদেশ যেতে চান। তবে ৬১.৭ শতাংশ দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী।

সানেম ও অ্যাকশনএইডের যৌথ জরিপে ৩৮.৭৬ শতাংশ তরুণ বিএনপিকে সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা দেখেন, জামায়াত ২১.৪৫ শতাংশ। মাত্র ১১.৮২ শতাংশ দলগুলোকে জনগণের সমস্যা নিয়ে কাজ করতে দেখেন। আইআরআই-এর জরিপে ৮৯ শতাংশ তরুণ ভোট দিতে আগ্রহী, ৮০ শতাংশ সুষ্ঠু নির্বাচনের আশা করেন, কিন্তু অতীত নির্বাচনগুলোকে অবৈধ মনে করেন ৬৭ শতাংশ।

চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাব্য ফলাফল : আগামী নির্বাচনে দুর্নীতি, বেকারত্ব (যুব বেকারত্ব ৪.৪৮ শতাংশ), অর্থনৈতিক সঙ্কট ও সংস্কার প্রধান ইস্যু হিসেবে সামনে এসেছে। তরুণরা আদর্শের চেয়ে শাসনের প্রতিশ্রুতি দেখছেন। সহিংসতা ও অনলাইন প্রচারণা (ইউটিউব, ফেসবুক) নির্বাচনকে প্রভাবিত করছে। বিএনপির এগিয়ে থাকার সম্ভাবনা বেশি বলছেন কেউ কেউ, কিন্তু জামায়াতের সাথে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের কথাও বলা হচ্ছে । মূলত অনিশ্চিত ভোটার ও অঞ্চলভিত্তিক ভিন্নতা ফলাফল অনিশ্চিত করে তুলেছে।

আন্তর্জাতিক দৃষ্টিতে নির্বাচন : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টিও এবার ব্যতিক্রমীভাবে নিবদ্ধ বাংলাদেশের দিকে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিতর্কিত নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক অবক্ষয়ের পর এই ভোটকে পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য, একটি ‘রিসেট মোমেন্ট’ হিসেবে দেখছে। জাতিসঙ্ঘও একাধিক বিবৃতিতে অংশগ্রহণমূলক, শান্তিপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এই নির্বাচন সুষ্ঠু হলে বাংলাদেশের সাথে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক নতুন গতি পেতে পারে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য মুখ হওয়ায় নির্বাচন ব্যবস্থাপনা নিয়ে বৈশ্বিক আস্থা তুলনামূলক বেশি। তবে একই সাথে তারা রাজনৈতিক সহিংসতা, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

এবারের নির্বাচনে দেশী পর্যবেক্ষকদের পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কমনওয়েলথ এবং কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থার পর্যবেক্ষক দল মাঠে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মিশনের পরিসর এখনো চূড়ান্ত নয়, তবু ভোটের দিন এবং ফল ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি গড়ার সুযোগ। তরুণদের কণ্ঠস্বর ও দলগুলোর প্রতিশ্রুতি পালনের সক্ষমতা নির্ধারণ করবে ভবিষ্যৎ। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে এটি গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার হবে; অন্যথায় নতুন সঙ্কটের আশঙ্কা রয়েছে।