সমুদ্রের বাতি : জুবায়ের হুসাইন
Printed Edition
গভীর সমুদ্রে ঘুটঘুটে অন্ধকারেও দেখা মিলবে আপাদমস্তক জ্বলজ্বলে ভুতুড়ে প্রাণীর। হয় সঙ্গীকে আকৃষ্ট করতে, না হয় শত্রুকে বিভ্রান্ত করতেই আলো ছড়ানোর এই গুণ পেয়েছে তারা। এমন কিছু অদ্ভুত সমুদ্রবাসী সম্পর্কে জানবো আমরা।
আলোকিত স্কুইড
সাগরের নিচে অন্ধকারে আলো জ্বালাতে সক্ষম একটি প্রাণী হাওয়াইয়ান ববটেইল স্কুইড ইউপ্রিমনাস্কোলোপস। এরা গভীর সমুদ্রে বা রাতে নিজেদের শরীর থেকে আলো বিকিরণ করে যোগাযোগ, শিকার ধরা বা আত্মরক্ষার জন্য ব্যবহার করে। এটি স্কুইডের বিশেষ অঙ্গ ফটোফোরের মাধ্যমে ঘটে যেখানে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় আলো উৎপন্ন হয়। এটি আলো উৎপন্নকারী ব্যাক্টেরিয়া ভাইব্রিও ফিশারিকে নিজ দেহে জায়গা দেয়। ফলে তখন ওই পরিবেশে এক মায়াবী আলোয় ভরে যায়। মজার ব্যাপার হচ্ছে- এই আলো নীল, সবুজ বা হলুদ রঙেরও হতে পারে। এমন কিছু প্রজাতির স্কুইড আছে যারা এই আলো ব্যবহার করে শিকারিকে চমকে দিয়ে বা বিভ্রান্ত করে পালিয়ে যায়।
জ্বলজ্বলে মাশরুম
বর্ষাকালে জাপানের ওয়াকাইয়ামায় এমন একটি মাশরুম জন্মায়, যা অন্ধকারে জ্বলতে থাকে। মিসেনা লাক্স-কোয়েলি নামের এ মাশরুমগুলো পড়ে থাকা চিনকুয়াপিন গাছ থেকে জন্মায় এবং যতই এগুলো বাড়তে থাকে, ততই আলো উৎপন্নকারী পিগমেন্টের কারণে ভৌতিক সবুজ বর্ণ ধারণ করে। জ্যাক-ও-ল্যানটার্ন নামের আরেক প্রজাতির মাশরুম নিজেদের দেহে সৃষ্ট বিভিন্ন বর্জ্য তাদের ফুলকা দিয়ে বের করে দেয়। এসব বর্জ্যরে মধ্যে কিছু আছে আলো উৎপন্নকারী রাসায়নিক ‘লুসিফেরাস’।
উত্তর-পূর্ব আমেরিকার আরেকটি সাধারণ প্রজাতির ক্ষুদ্র মাশরুম প্যানেলাসস্ট্রিপটিকাস। এটিও আলো ছড়াতে পারে।
লাল স্রোত
ডাইনোফ্ল্যাজেলেট হচ্ছে এক জাতের সামুদ্রিক শৈবাল। তবে মিঠাপানিতেও এদের সমান বিচরণ। এরা মাঝে মধ্যে পানিতে এত বেশি পরিমাণে দলবদ্ধ থাকে যে, পানিকে লাল বলে মনে হয়। এমনটি ঘটলে তাকে বলে রেড টাইড। এই প্রকার শৈবাল যখন খুব দ্রুত সংখ্যায় বেড়ে ওঠে, তখন একে ‘অ্যালগাল ব্লুম’ বা ‘শৈবাল পুষ্ট’ বলা হয়। এই বিপুল শৈবালের কারণে পানি লালচে-বাদামি রঙ ধারণ করে এবং বিষাক্ত পদার্থ উৎপন্ন করতে পারে যা মাছ, সামুদ্রিক প্রাণী ও মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। এটি মূলত পুষ্টির প্রাচুর্য যেমন পানির মধ্যে নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের বৃদ্ধি সূর্যালোক এবং উষ্ণ পানির কারণে ঘটে এবং এর ফলে প্রচুর মাছ মরে ভেসে ওঠে। তখন পানি অক্সিজেন কমে যায়, যা সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর।
জেলিফিশ
জেলিফিশ খুবই সতর্ক। আর তাই শিকারির হাতে ধরা পড়ার পর এটি চমৎকার আলোকচ্ছটা তৈরি করতে শুরু করে। এই আশায় যে অন্য কোনো প্রাণী এসে শিকারিকে আক্রমণ করবে, আর প্রাণে বেঁচে যাবে জেলিফিশ। গভীর সমুদ্রের জেলিফিশ অ্যাটোলা ওয়াইভিলের ভেতর আছে এ ধরনের সতর্ক আলো তৈরির দারুণ ক্ষমতা।
মধ্য সমুদ্রের বিস্ময়
ব্যাথোসাইরো নামের জ্বলজ্বলে সামুদ্রিক প্রাণীটির বাস সমুদ্রের মাঝামাঝি গভীরতায়। সহজেই এটি কুঁকড়ে যায়। আর তাই এ পর্যন্ত কেবল একবার প্রাণীটির বর্ণনা দেয়া সম্ভব হয়েছিল। তা-ও সেই ১৯৭৮ সালে। এ প্রজাতির প্রাণীরা নীল ও সবুজ আলোকচ্ছটা তৈরি করতে পারে।
সবুজ বোমারু
সমুদ্রের প্রায় দুই হাজার ফুট গভীরে এমন একটি চিংড়ি জাতীয় প্রাণী পাওয়া গেছে যেটি কিনা শত্রুকে বিভ্রান্ত করতে সবুজ রঙের আলোর বোমা তৈরি করতে পারে। পায়ের দিকে থলের ভেতর থাকে ওই আলো-বোমার উপকরণ। সময়মতো ওটা ফাটিয়েই আলো ছড়ায় সে।