স্বল্পমেয়াদি সরিষা চাষে আশার আলো দেখাচ্ছে বাকৃবির গবেষণা
হাওরের পতিত জমিতে নতুন সম্ভাবনা
Printed Edition
বাকৃবি প্রতিনিধি
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অঞ্চল জলবায়ুজনিত নানা ঝুঁকির কারণে দীর্ঘ দিন ধরেই কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তার মুখে রয়েছে। বাটি আকৃতির এই ভূপ্রকৃতিতে বর্ষা মৌসুমে বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গিয়ে জলাভূমিতে পরিণত হয়। এতে এখানকার কৃষিব্যবস্থা দেশের অন্য অঞ্চলের তুলনায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। প্রধান ফসল বোরো ধান হলেও আগাম বন্যা, শিলাবৃষ্টি, খরা ও শীতজনিত চাপ নিয়মিতভাবে উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, স্বল্পমেয়াদি সরিষা চাষ হাওরের প্রচলিত পতিত-বোরো-পতিত শস্যক্রমে যুক্ত হলে কৃষি বৈচিত্র্য বাড়বে এবং কৃষকের আর্থিক ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর এবং বোরো ধান রোপণের আগের অব্যবহৃত সময়কে কাজে লাগিয়ে সরিষা আবাদ করলে কৃষকরা অতিরিক্ত একটি ফসল ঘরে তুলতে পারবেন।
গতকাল সোমবার গবেষণা প্রকল্পের অগ্রগতি ও ফলাফল তুলে ধরেন প্রকল্পের প্রধান গবেষক বাকৃবির কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম মমিনুল ইসলাম। সহযোগী গবেষক হিসেবে ছিলেন একই বিভাগের অধ্যাপক ড. মো: পারভেজ আনোয়ার।
‘কৃষকদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলে বিদ্যমান পতিত-বোরো-পতিত ফসলক্রমে সরিষা প্রবর্তন’ শীর্ষক এই প্রকল্পটি ২০২৩ সাল থেকে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার হাওর এলাকায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সিস্টেমের (বাউরেস) তত্ত্বাবধানে এবং সিটি ব্যাংকের অর্থায়নে প্রকল্পটি পরিচালিত হচ্ছে।
গবেষকরা জানান, হাওর অঞ্চলের মোট আবাদি জমির প্রায় ৪০ শতাংশেই পতিত-বোরো-পতিত শস্যক্রম অনুসরণ করা হয়, যার ফলে রবি মৌসুমে বিপুল পরিমাণ জমি অনাবাদি থাকে। স্বল্পমেয়াদি সরিষা চাষ এই শূন্য সময়কে কাজে লাগিয়ে অন্তত একটি নিশ্চিত ফসল নিশ্চিত করতে পারে, এমনকি বোরো ধান প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও।
গবেষণার প্রথম বছর (২০২৩-২৪) বাকৃবি, বারি ও বিনা উদ্ভাবিত ছয়টি স্বল্পমেয়াদি সরিষার জাত তিনটি ভিন্ন সময়ে (১০, ২০ ও ৩০ নভেম্বর) বপন করে পরীক্ষা করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, ২০ নভেম্বর বপনে বিনা সরিষা-৯ সর্বোচ্চ ফলন দেয়, যার কাছাকাছি ফলন পাওয়া যায় বারি সরিষা-১৭ থেকে। সরিষার পরবর্তী ফসল হিসেবে ব্রি ধান-১০০ গড়ে হেক্টরপ্রতি ৬ দশমিক ২ টন ফলন দেয়।
দ্বিতীয় বছর (২০২৪-২৫) গবেষণায় নির্বাচিত বিনা সরিষা-৯ ও বারি সরিষা-১৭ জাতকে বিভিন্ন সার ও বীজ ব্যবস্থাপনায় পরীক্ষা করা হয়। প্রস্তাবিত বীজ হার (হেক্টরপ্রতি ৮ কেজি) ও শতভাগ সার প্রয়োগে বিনা সরিষা-৯ সর্বোচ্চ ফলন দেয়। সরিষার পর হাইব্রিড বোরো ধান ‘সবুজ সাথী’ গড়ে হেক্টরপ্রতি ৬ দশমিক ৪ টন ফলন দেয় এবং পুরো শস্যক্রমে ধান সমতুল্য ফলন দাঁড়ায় ১০ দশমিক ১ টন।
গবেষণার তৃতীয় বছর (২০২৫-২৬) বর্তমানে চলমান। গবেষকদের আশা, প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে হাওর অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন ও কৃষকের আয় বাড়বে এবং জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যেও খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার হবে।