ধুলোর গ্লানি মুছে নান্দনিকতায় বদলে যাচ্ছে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক
সবুজ করিডোর, সৌন্দর্য, স্বস্তি ও পরিবেশের নতুন বার্তা
Printed Edition
মো: সাজ্জাতুল ইসলাম ময়মনসিংহ অফিস
একসময় ধুলা, ধোঁয়া আর অসহনীয় যানজটই ছিল ঢাকা-ময়মনসিংহ সহাসড়কের পরিচয়। কিন্তু সেই চিরচেনা ধূসর মহাসড়ক এখন সেজেছে নতুন সাজে। রাজধানী থেকে উত্তরাঞ্চলমুখী এই ব্যস্ত মহাসড়ক এখন কেবল ইট-পাথরের কাঠামো নয়, বরং ঋতুরাজ বসন্তের আগমনে হয়ে উঠেছে একটি ‘সবুজ ও রঙিন করিডোর’। সড়কের মাঝখানে (মিডিয়ান) সারিবদ্ধ গাছে ফুটে থাকা গোলাপি আর বেগুনি ফুলের আভা দূর থেকে মনে হয় যেন দিগন্তজোড়া এক রঙিন ফুলের গালিচা। ঢাকা ছেড়ে গাজীপুর পার হয়ে ভালুকা, ত্রিশাল ও ময়মনসিংহ অভিমুখে এগোতেই চোখে পড়ে এই নান্দনিক দৃশ্য। সকালে কুয়াশাভেজা স্নিগ্ধতা হোক কিংবা বিকেলের মায়াবী আলো- দুই সময়েই ফুলে মোড়া এই মহাসড়ক যাত্রীদের চোখে প্রশান্তি এনে দিচ্ছে। মালবাহী ট্রাক কিংবা যাত্রীবাহী বাসের তীব্র গতির মধ্যেও প্রকৃতির এই স্নিগ্ধ আয়োজন পথচলার ক্লান্তি ভুলিয়ে দিচ্ছে নিমেষেই।
পরিকল্পিত বনায়নে বদলেছে রূপ : সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মহাসড়কের সৌন্দর্যবর্ধন ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় কয়েক বছর আগে বিভিন্ন প্রজাতির শোভাবর্ধনকারী গাছ রোপণ করা হয়েছিল। নিয়মিত পরিচর্যা ও ছাঁটাইয়ের ফলে গাছগুলো এখন পূর্ণতা পেয়েছে। বিশেষ করে বসন্তের আগমনে গাছগুলোতে অসংখ্য ফুল একসাথে ফুটে থাকায় পুরো মহাসড়ক এখন এক দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে।
সওজ ময়মনসিংহের এক নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, মহাসড়ক কেবল দ্রুত যোগাযোগের মাধ্যমই নয়, এটি একটি জনপদের রুচি ও পরিচয়ের স্মারক। আমরা চেয়েছি আধুনিক অবকাঠামোর সাথে প্রকৃতির এক মেলবন্ধন তৈরি করতে। এই পরিকল্পিত বনায়ন একদিকে যেমন পরিবেশ রক্ষা করছে, তেমনি যাত্রীদের মানসিক স্বস্তিও দিচ্ছে।
যাত্রী ও স্থানীয়দের মুগ্ধতা : ঢাকা থেকে শেরপুরগামী নিয়মিত যাত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, দীর্ঘ পথযাত্রা সাধারণত একঘেয়ে ও ক্লান্তিকর হয়। কিন্তু এখন এই মহাসড়কে উঠলে মনে হয় কোনো উদ্যানের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। চোখের সামনে এমন রঙিন ফুল থাকলে ক্লান্তি অনেক কমে যায়। ত্রিশাল এলাকার স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, মহাসড়কের এই নতুন রূপ দেখতে অনেকেই এখন গাড়ি থামিয়ে ছবি তুলছেন। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ‘ফুলের করিডোরে’র ছবি ছড়িয়ে পড়ায় এলাকার পরিচিতিও বাড়ছে। স্থানীয়দের মতে, এই উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে মহাসড়কটি ভবিষ্যতে একটি পরিবেশবান্ধব পর্যটন গন্তব্য হিসেবেও স্বীকৃতি পেতে পারে।
পরিবেশবিদদের মূল্যায়ন : পরিবেশবিদরা এই উদ্যোগকে ‘সবুজ উন্নয়ন’-এর এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, মহাসড়কের মাঝখানে ও দুই পাশে গাছের সারি থাকলে তা বাতাস থেকে কার্বন ও ধুলাবালি শোষণে বড় ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি পিচঢালা সড়কের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও এটি সহায়ক।
ময়মনসিংহের একজন পরিবেশকর্মী বলেন, উন্নয়ন ও প্রকৃতি যে হাত ধরাধরি করে চলতে পারে, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক তার বড় প্রমাণ। তবে এই সৌন্দর্য ধরে রাখাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
রক্ষণাবেক্ষণের চ্যালেঞ্জ : নান্দনিক এই পরিবর্তনের মাঝে কিছু নেতিবাচক দিকও চোখে পড়ছে। সড়কের কিছু অংশে গাছের ডাল ভেঙে ফেলা কিংবা পথচারীদের ফেলে রাখা ময়লা-আবর্জনায় বিঘœ ঘটছে সৌন্দর্যে। সচেতন নাগরিকরা নিয়মিত নজরদারি ও কঠোর রক্ষণাবেক্ষণের দাবি জানিয়েছেন। সওজ কর্তৃপক্ষ অবশ্য আশ্বস্ত করেছে, ক্ষতিগ্রস্ত গাছ আবার রোপণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় এই সবুজ বেষ্টনী সুরক্ষায় আরো জোরালো পদক্ষেপ নেয়া হবে।
উন্নয়ন আর নান্দনিকতার মিশেলে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক এখন কেবল গন্তব্যে পৌঁছানোর পথ নয়, বরং সড়কটি হয়ে উঠেছে ভ্রমণের এক সুন্দর অভিজ্ঞতা।