ভোক্তা ঋণ ব্যবস্থায় গতি বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন সিদ্ধান্ত

নতুন নীতিতে চাঙা হতে পারে দেশীয় অটোমোবাইল শিল্প

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

দেশের অটোমোবাইল শিল্পের বিকাশে নতুন প্রণোদনা দিতে এবং ভোক্তা ঋণ ব্যবস্থাকে আরো গতিশীল করতে নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে জারি করা এক সার্কুলারে, বৈদ্যুতিক (ইভি), হাইব্রিড এবং দেশে উৎপাদিত গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে ঋণের সীমা বাড়ানো হয়েছে। একই সাথে ব্যক্তিগত ঋণের মেয়াদও বাড়ানো হয়েছে, যা গ্রাহকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্বস্তি এনে দিতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, সাধারণ গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা পাবেন। তবে বৈদ্যুতিক, হাইব্রিড এবং দেশীয়ভাবে উৎপাদিত যানবাহনের ক্ষেত্রে এই সীমা বাড়িয়ে ৮০ লাখ টাকা করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, পরিবেশবান্ধব ও স্থানীয় শিল্পে উৎপাদিত যানবাহনের ব্যবহার উৎসাহিত করতে এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তে শুধু ঋণের পরিমাণই নয়, গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে গ্রাহকের নিজস্ব বিনিয়োগের বাধ্যবাধকতাও শিথিল করা হয়েছে। আগে সাধারণভাবে ঋণ ও নিজস্ব বিনিয়োগের অনুপাত ছিল ৬০ অনুপাত ৪০। অর্থাৎ একটি গাড়ি কিনতে হলে গ্রাহককে মোট মূল্যের অন্তত ৪০ শতাংশ নিজস্ব তহবিল থেকে দিতে হতো। নতুন নিয়মে বৈদ্যুতিক, হাইব্রিড ও দেশীয় গাড়ির ক্ষেত্রে এই অনুপাত ৮০ অনুপাত ২০ নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে মাত্র ২০ শতাংশ নিজস্ব অর্থ বিনিয়োগ করেই গ্রাহকরা এসব গাড়ি কেনার সুযোগ পাবেন। ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত দেশের উদীয়মান অটোমোবাইল শিল্পের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। বর্তমানে বাংলাদেশে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান মোটরযান সংযোজন ও উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন নীতির ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত গাড়ির চাহিদা বাড়তে পারে। একই সাথে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিনির্ভর যানবাহনের বাজার সম্প্রসারণেও এটি সহায়ক হবে। অন্য দিকে, ব্যক্তিগত ঋণ এবং ভোগ্যপণ্য কেনার ঋণের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যক্তিগত ঋণের সর্বোচ্চ মেয়াদ বাড়িয়ে আট বছর নির্ধারণ করেছে। আগে এ ধরনের ঋণের মেয়াদ তুলনামূলক কম হওয়ায় মাসিক কিস্তির চাপ বেশি ছিল। নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার ফলে গ্রাহকরা দীর্ঘ সময় ধরে ঋণ পরিশোধের সুযোগ পাবেন এবং মাসিক কিস্তির পরিমাণও কমে আসতে পারে।

ব্যাংকারদের মতে, ব্যক্তিগত ঋণের মেয়াদ বৃদ্ধি মধ্যবিত্ত ও চাকরিজীবী গ্রাহকদের জন্য বিশেষভাবে উপকারী হবে। গৃহস্থালি প্রয়োজন, শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা টেকসই ভোগ্যপণ্য কেনার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ বাড়বে। এর ফলে ভোক্তা ব্যয়ও বৃদ্ধি পেতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। নতুন সার্কুলারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভোক্তা ঋণের প্রবৃদ্ধির ওপর বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা প্রত্যাহার। ২০১৭ সালের নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, কোনো ব্যাংকের ভোক্তা ঋণের প্রবৃদ্ধি তার মোট ঋণ প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি হতে পারবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন সেই শর্ত বাতিল করেছে। ফলে ব্যাংকগুলো চাইলে ভোক্তা ঋণ খাতে আরো বেশি অর্থায়ন করতে পারবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ ব্যাংকগুলোর জন্য নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি করবে এবং অর্থনীতিতে চাহিদা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করবে। তবে একই সাথে ঋণ বিতরণে ঝুঁঁকি ব্যবস্থাপনা ও গ্রাহকের পরিশোধ সক্ষমতা যাচাইয়ের বিষয়েও ব্যাংকগুলোকে সতর্ক থাকতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারার ক্ষমতাবলে জারি করা এই নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর হবে। সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, নতুন নীতিমালা দেশের অটোমোবাইল শিল্প, ভোক্তা অর্থায়ন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি সঞ্চার করবে।