রানীনগরে তদারকির অভাব
এডব্লিউডি প্রকল্প ভেস্তে যাওয়ায় সম্ভাবনা হারাচ্ছেন কৃষকরা
Printed Edition
কাজী আনিছুর রহমান রানীনগর (নওগাঁ)
নওগাঁর রানীনগরে আধুনিক সেচব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন ‘অল্টারনেটিভ ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং’ (এডব্লিউডি) প্রযুক্তি প্রদর্শনী প্রকল্প মাঠপর্যায়ে তদারকি ও সমন্বয়ের অভাবে কার্যত ভেস্তে গেছে। ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় রোধ, সেচ খরচ কমানো এবং ধানের উৎপাদন বাড়ানোর ল্য নিয়ে প্রকল্পটি চালু করা হলেও সংশ্লিষ্টদের অবহেলায় কৃষকেরা এর সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এতে সরকারের অর্থ ব্যয়ের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, ‘প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনরশিপ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ (পার্টনার)’ কর্মসূচির আওতায় এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। উপজেলার চারটি ব্লকে চারজন কৃষককে দুই একর করে মোট আট একর জমিতে প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়। নির্বাচিত কৃষকেরা হলেন- জলকৈ গ্রামের কামরুল ইসলাম, চকবলরাম গ্রামের ওসমান আলী, কালীগ্রাম কসবাপাড়া গ্রামের বাবু সরদার এবং আতাইকুলা গ্রামের আমিনুল ইসলাম।
গতবছর ১৭ ডিসেম্বর প্রকল্পের আওতায় তাদের উন্নত জাতের ব্রি-১০২ ধানের বীজ, ইউরিয়া, ডিএপি, পটাশ, জৈব সার, জিপসাম, দস্তা, বোরন সারসহ বিভিন্ন উপকরণ দেয়া হয়। পাশাপাশি এডব্লিউডি পদ্ধতি প্রয়োগের জন্য নির্দিষ্ট মাপের পিভিসি পাইপ সরবরাহের কথাও ছিল এবং প্রতিটি ব্লকে একজন করে ফিল্ড সুপারভাইজার নিয়োগ দেয়া হয়।
প্রকল্পের নির্দেশনা অনুযায়ী, ধান রোপণের ১২ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে জমিতে নির্দিষ্ট দূরত্বে ছিদ্রযুক্ত পিভিসি পাইপ স্থাপন করতে হয়। এরপর একবার সেচ দেওয়ার পর পাইপের ভেতরের পানির স্তর পর্যবেণ করে পরবর্তী সেচ নির্ধারণ করতে হয়। এভাবে পর্যায়ক্রমে জমি ভেজানো ও শুকানোর মাধ্যমে পানির ব্যবহার ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হয় এবং একই সাথে ফলনও ভালো পাওয়া যায়।
তবে বাস্তবে দেখা গেছে, অধিকাংশ কৃষকই এই পদ্ধতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা পাননি। কৃষকদের অভিযোগ, প্রকল্পের উপকরণ দেয়া হলেও প্রযুক্তি ব্যবহারের কোনো প্রশিণ বা মাঠপর্যায়ের নির্দেশনা দেয়া হয়নি। ফলে তারা প্রচলিত নিয়মেই জমিতে নিয়মিত সেচ দিয়ে ধান চাষ করছেন।
চকবলরাম গ্রামের কৃষক ওসমান আলী বলেন, ‘পাইপ দেয়া হলেও কিভাবে বসাতে হবে, তা কেউ দেখাননি। ফলে আমরা আগের মতোই পানি দিচ্ছি।’ অন্য দিকে বাবু সরদার, আমিনুল ইসলাম ও কামরুল ইসলাম জানান, তারা অনেক উপকরণ পেলেও পাইপ পাননি এবং এই প্রযুক্তির উদ্দেশ্য সম্পর্কেও পরিষ্কার ধারণা দেয়া হয়নি।
এ দিকে সংশ্লিষ্ট ব্লকের সুপারভাইজাররা দাবি করেন, কৃষকদের সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তারা সাড়া দেননি। ফলে অনেক েেত্র পাইপ বিতরণ করা সম্ভব হয়নি। তবে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোস্তাকিমা খাতুন এ বিষয়ে বলেন, মাঠপর্যায়ের দায়িত্বপ্রাপ্তদের সমন্বয়হীনতা ও গাফিলতির কারণেই প্রকল্পটি প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি।
নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক হোমায়রা মণ্ডল বলেন, এমন প্রকল্পে নিয়মিত তদারকি ও পর্যবেণ থাকা জরুরি। প্রতি সপ্তাহে বা নির্দিষ্ট সময় অন্তর অগ্রগতি পর্যালোচনার কথা থাকলেও তা সঠিকভাবে হয়নি। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি জানান।
স্থানীয় কৃষক ও সচেতন মহলের মতে, সময়োপযোগী ও সম্ভাবনাময় এই প্রযুক্তি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে পানি সাশ্রয়ের পাশাপাশি উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব ছিল। কিন্তু প্রশিণ ও তদারকির অভাবে সেই সম্ভাবনা নষ্ট হয়েছে। তারা দ্রুত দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ভবিষ্যতে এমন প্রকল্পে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।