পল্টনের তপ্ত পিচঢালা পথে এক থালায় ইফতার

যেখানে বিলীন হয় পথের দূরত্ব, মানুষের ভেদাভেদ

Printed Edition
back-2
বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ এলাকায় ফুটপাথের ব্যবসায়ীদের ইফতার : নয়া দিগন্ত

হাবিবুল বাশার

মাগরিবের আজান হতে তখনো মিনিট দশেক বাকি। জিপিও মোড় থেকে পল্টনগামী রাস্তার ধুলোবালু আর গাড়ির কালো ধোঁয়ার আড়ালে ফুটপাথের এক কোণে গোল হয়ে বসেছেন একদল মানুষ। দিনের তপ্ত রোদে উত্তপ্ত হয়ে থাকা কংক্রিটের ওপর বিছানো হয়েছে পুরনো খবরের কাগজ। তার ওপর একটি প্লাস্টিকের গামলায় পরম মমতায় মাখানো হচ্ছে মুড়ি, ছোলা আর পেঁয়াজু। সারা দিনের হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে রিকশার প্যাডেল ছেড়ে আসা চালক, ফুটপাথে বেল্ট-মানিব্যাগ বিক্রেতা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আর ধুলোমাখা ছিন্নমূল পথশিশুরা এখানে আজ এক কাতারে। কোনো আভিজাত্য নেই, নেই কোনো সুশৃঙ্খল দস্তরখান; আছে শুধু ভাগ করে নেয়ার এক অপার্থিব মানবিক টান।

পল্টনের এই খোলা আকাশের নিচের আয়োজনে যারা শরিক হন, তাদের প্রত্যেকেরই ঘরে ফেরার আকুতি থাকলেও সামর্থ্য বা পরিস্থিতির কারণে রাজপথই তাদের ঠিকানা। নিজেদের যৎসামান্য আয় থেকে প্রতিদিন ২০-৩০ টাকা করে জমিয়ে তারা এই যৌথ ইফতারের আয়োজন করেন। সারা মাস রোজা রেখে যখন নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে অন্যের জন্য খাবারের ভাগ সাজান, তখন সেখানে অভাবের চেয়ে ত্যাগের মহিমা বড় হয়ে ওঠে। এটি কেবল পেট ভরার আয়োজন নয়, বরং নাগরিক ব্যস্ততায় হারিয়ে যাওয়া এক টুকরো হৃদস্পন্দন।

ইফতারের পাতে যা থাকে : তাদের এই ঘরোয়া আয়োজনে দামি কোনো ফল বা ভিনদেশী খাবারের জৌলুশ নেই। একটি প্লাস্টিকের জগে বালতি থেকে ভরা সাধারণ চিনির শরবত, কয়েক টুকরো কাটা শসা, কাঁচামরিচ দিয়ে মাখানো এক গামলা মুড়ি-ছোলা আর হয়তো দুই-একটি খেজুর। এই সামান্য খাবারটুকুই যখন গোল হয়ে বসে সবাই মিলে পাতে তুলে নেন, তখন দীর্ঘক্ষণ উপোস থাকা ক্লান্ত মুখগুলোতে এক অদ্ভুত তৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠে। নিজেরা নিজেদের চাঁদায় কেনা এই খাবারে কোনো দাতা-গ্রহীতার সম্পর্ক নেই, আছে সমবায়ের এক অনন্য উদাহরণ।

পথশিশু, শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর আত্মিক বন্ধন

এই ইফতার আসরের সবচেয়ে স্পর্শকাতর দিক হলো এর বন্ধন। দিনভর কাগজ কুড়ানো ক্লান্ত পথশিশুটির জন্য রিকশাচালক নিজ হাতে শরবত ঢেলে দিচ্ছেন, আবার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তার সামনের মুড়ির ভাগটি এগিয়ে দিচ্ছেন রিকশাওয়ালার দিকে। এখানে কেউ কারো আত্মীয় নয়; কিন্তু অভাব আর শ্রমের অভিন্ন গল্প তাদের একে অপরের ‘আত্মার আত্মীয়’ করে তুলেছে। সমাজ ও রাষ্ট্রের তৈরি করা সকল অদৃশ্য দেয়াল যেন এই আজানের আগমুহূর্তে পল্টনের ধুলোবালুতে মিশে একাকার হয়ে যায়।

রিকশাচালক আবছার মিয়া বলেন, সারা দিন রিকশা চালানোর পর একলা ইফতার করতে মন চায় না। এখানে হকার ভাইদের সাথে মিলেমিশে ইফতার করলে মনে হয় নিজের বাড়িতেই আছি।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, দোকান ফেলে ইফতারে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাই পাশের দোকানদার আর রিকশাওয়ালা ভাইদের নিয়ে একসাথেই বসি। সাথে পথশিশুগুলোকেও ডাকি। নিজেরা যা খাই, ওদের সাথে ভাগ করে খেলে মনে হয় ইবাদতটা পূর্ণ হলো।

পথশিশু রাসেল জানায়, ইফতারের সময় হলে এই মোড়ের মামারা আমাকে ডেকে নিয়ে সাথে বসায়। আমাগো তো কিনার টাকা নাই, মামারাই মুড়ি আর শরবত দেয়। সবার সাথে বসে খেলে খুব ভালো লাগে।

যখন শহরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রেস্টুরেন্টে বিপুল পরিমাণ খাবার অপচয় হয়, তখন পল্টনের এই ধুলোমাখা মানুষগুলো শিখিয়ে দেন প্রকৃত সৌহার্দ্য। রাজপথের এই মিলনমেলা প্রমাণ করে যে, মানবিকতা কেবল বিত্তশালীদের ড্রয়িংরুমের বিষয় নয়; বরং রাজপথের এই অবহেলিত মানুষগুলোই দিনশেষে ভাগ করে নেয়ার প্রকৃত শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন। আজান হওয়ার সাথে সাথে যখন সবাই একসাথে বিসমিল্লাহ বলে খাবার মুখে তোলেন, তখন পল্টনের ব্যস্ত রাস্তাটি আর কেবল যাতায়াতের পথ থাকে না, হয়ে ওঠে মানবিকতার এক অনন্য পাঠশালা।