রাজনৈতিক ছায়ায় সঙ্কটে রাজধানীর গণপরিবহন
Printed Edition
আব্দুল কাইয়ুম
রাজধানীর সড়কগুলোতে গণপরিবহন ব্যবস্থাপনায় চরম বৈষম্য দেখা যাচ্ছে। কিছু সড়কে অতিরিক্ত বাস চলাচল করলেও অধিকাংশ সড়কে পর্যাপ্ত বাস পাওয়া যায় না। ফলে অনেক েেত্র যাত্রীদের দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকে বাসের জন্য অপো করতে হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি গণপরিবহনের সংখ্যার ঘাটতি নয়; বরং রুট বণ্টনে রাজনৈতিক বিবেচনা ও অব্যবস্থাপনার কারণেই এই সমস্যা তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে লাভজনক সড়কগুলোতে বেশি বাস নামানো হয়েছে। যেখানে যাত্রী বেশি, সেখানে পরিবহন মালিকরা অতিরিক্ত বাস পরিচালনা করছেন। বিপরীতে রাজধানীর অনেক সড়কে বাসের সংখ্যা কম থাকায় যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপো করতে হয়। অথচ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপরে (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ২৯১টি রুটে প্রায় ৯ হাজার ২৭টি বাস চলাচল করে।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থাকে বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে পুনর্বিন্যাস করা জরুরি। তাদের মতে, ঢাকায় বাস চলাচলের জন্য ২০০ থেকে ২৫০ কিলোমিটার সড়কই যথেষ্ট। অথচ বর্তমানে প্রায় ৩৫০টি রুটে বাস চলাচল করছে, যার বেশির ভাগই অকার্যকর বা অপ্রয়োজনীয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাজার হাজার মালিকের পরিবর্তে চার থেকে পাঁচটি কোম্পানির মাধ্যমে গণপরিবহন পরিচালনা করা গেলে ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা সম্ভব।
এদিকে রাজধানীতে চলাচলকারী অধিকাংশ বাসের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। অনেক বাসের রঙ চটে গেছে, ইন্ডিকেটর বা পেছনের লাইট নেই, সামনের গ্লাস তিগ্রস্ত। অনেক েেত্র যাত্রীদের বসার আসনও অস্বস্তিকর। বাসে ওঠানামার পাদানি ও হ্যান্ডেল ভাঙা থাকায় যাত্রীরা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ভ্রমণ করেন। যাত্রীদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপ বিভিন্ন সময়ে সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।
এ ছাড়া রাজধানীতে চলাচলকারী অনেক বাসের বাণিজ্যিক আয়ুষ্কালও শেষ হয়ে গেছে। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী বাস ও মিনিবাসের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ২০ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বিআরটিএর হিসাবে দেখা যায়, ঢাকাসহ সারা দেশে চলাচলকারী ৭৫ হাজারের বেশি বাস, মিনিবাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও ট্যাংকলরির আয়ুষ্কাল ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। তবুও এসব যানবাহন দীর্ঘদিন ধরে সড়কে চলাচল করছে। ফলে দুর্ঘটনা, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে।
জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) এক সমীায় দেখা গেছে, ঢাকা মহানগরে প্রতিদিন গড়ে প্রায় চার কোটি যাত্রী চলাচল করেন। এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ গণপরিবহন ব্যবহার করেন এবং এদের ৬৭ শতাংশই বাসের ওপর নির্ভরশীল। অথচ প্রায় দুই দশক আগে গণপরিবহনব্যবস্থার উন্নয়নের উদ্যোগ নেয়া হলেও এখনো সেই মানের উন্নয়ন হয়নি।
নগরবাসীর অভিযোগ, ঢাকার নির্দিষ্ট কিছু সড়কে সবসময় বাস পাওয়া গেলেও অধিকাংশ সড়কে বাসের দেখা মেলে না। বিশেষ করে রাতে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে যায়। অনেক বাস নির্ধারিত স্টপেজে না থেমে যাত্রী দেখলেই যেখানে-সেখানে থামে, যা যানজটের অন্যতম কারণ। একই রুটে একাধিক কোম্পানির বাস চলাচল করায় যাত্রী তুলতে প্রতিযোগিতা তৈরি হয় এবং তা থেকে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।
রাকিবুল হাসান নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রতিদিন অফিসে যাতায়াত করতে গিয়ে গণপরিবহনের কারণে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। শাহবাগ থেকে কমলাপুর যাওয়ার জন্য অনেক সময় দীর্ঘণ দাঁড়িয়ে থেকেও বাস পাওয়া যায় না। এই রুটে মাত্র একটি বাস সার্ভিস আছে, অথচ অন্য রুটে পাঁচ-ছয়টি বাস চলে। এতে প্রতিদিনই দুর্ভোগ পোহাতে হয়।’ তিনি বলেন, নির্ধারিত টিকিট ব্যবস্থা না থাকায় অনেক বাসে ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজধানীর মিরপুর, বাড্ডা-রামপুরা, বিমানবন্দর, উত্তরা, আজিমপুর, গুলিস্তান ও যাত্রাবাড়ী সড়কে তুলনামূলক বেশি বাস চলাচল করে। কিন্তু অন্যান্য সড়কে বাসের সংখ্যা কম হওয়ায় যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপো করতে হয় বা বিকল্প হিসেবে রিকশা ও সিএনজির ওপর নির্ভর করতে হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর পরিবহনব্যবস্থা কার্যত নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় রয়েছে। এতে করে প্রতিদিনই যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ছে। যানজট, বিশৃঙ্খলা এবং অনিরাপদ পরিবহনব্যবস্থার কারণে নগরবাসী প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। পাশাপাশি অকার্যকর রুট ও যানজটের কারণে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক তি হচ্ছে এবং প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে বিপুল কর্মঘণ্টা। নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য এ পরিস্থিতি আরো কষ্টকর হয়ে উঠেছে।
এদিকে রাজধানীতে নারীদের জন্য নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য যাতায়াত নিশ্চিত করতে বিশেষায়িত বাস সার্ভিস চালুর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। গত সোমবার দেয়া এ নির্দেশনায় তিনি নগর পরিবহনে শৃঙ্খলা আনা এবং যাত্রীসেবার মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার কথাও বলেন।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো: মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘গণপরিবহনে পরিবর্তন আনা এখন অত্যন্ত জরুরি। যে সরকারই মতায় আসুক, এই খাতে সংস্কার আনতেই হবে। যানজটের কারণে বছরে যে আর্থিক তি হয়, সেই অর্থ দিয়ে চারটি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব।’
তিনি বলেন, ‘মাত্র চার থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করলে রাজধানীর গণপরিবহনের চেহারা পাল্টে দেয়া সম্ভব। অথচ দেশে চার থেকে পাঁচ লাখ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে, কিন্তু গণপরিবহন সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।’ তিনি আরো বলেন, বিগত সময়ে পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সমস্যার সমাধান হয়নি। রাজধানীর অধিকাংশ গণপরিবহন চলাচলের অযোগ্য অবস্থায় রয়েছে। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য বাস রুট রেশনালাইজেশন এবং বাসের জন্য পৃথক লেন চালুর প্রয়োজন রয়েছে।
তার মতে, রাজধানীতে ছয়টি মেট্রোরেল সম্পূর্ণভাবে চালু হলেও তা সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ যাত্রীকে সেবা দিতে পারবে। বাকি ৭০ শতাংশ মানুষকে এখনো বাসসহ অন্যান্য গণপরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হবে।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. মো: হাদিউজ্জামান বলেন, ‘রাজধানীতে গণপরিবহনের সঙ্কট মূলত সংখ্যাগত নয়; এটি ব্যবস্থাপনার সঙ্কট। অনেক সড়কে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি বাস চলাচল করছে, আবার অনেক সড়কে বাসের তীব্র অভাব।’
তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক বিবেচনায় রুট অনুমোদন দেয়ার ফলে এই অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে। ফলে কোথাও যাত্রী নিয়ে বাসের মধ্যে প্রতিযোগিতা হচ্ছে, আবার কোথাও যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপো করতে হচ্ছে।’
ড. হাদিউজ্জামান আরো বলেন, রাজধানীতে বাস চলাচলের উপযোগী সড়কের সংখ্যা সীমিত। তাই রুটগুলোকে বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে পুনর্গঠন করা জরুরি। হাজার হাজার মালিকের পরিবর্তে কয়েকটি কোম্পানির অধীনে গণপরিবহন পরিচালনা করলে ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা সম্ভব। তিনি বলেন, ‘ঢাকায় বাস চলাচলের জন্য ৩৫০টি রুটের প্রয়োজন নেই; ৪০ থেকে ৪৫টি রুটই যথেষ্ট। তবে এটি শুধু কাগজে-কলমে থাকলে হবে না, বাস্তবায়ন করতে হবে।’
তার মতে, গুলশান চাকা, হাতিরঝিল চক্রাকার বাস এবং ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় কোম্পানি-ভিত্তিক বাস চালুর মতো উদ্যোগ ইতোমধ্যে কিছুটা সফল হয়েছে। কিন্তু পুরো ঢাকায় এই ব্যবস্থা চালু করতে না পারার প্রধান বাধা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অভাব।