নিরাপদ প্রেসিডেন্ট ও ফার্স্টলেডি
সাংবাদিকদের সাথে ট্রাম্পের নৈশভোজে বন্দুক হামলা
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে আবারো এক ভয়াবহ হামলার চেষ্টা চালানো হয়েছে। গত শনিবার রাতে ওয়াশিংটন ডিসির ‘ওয়াশিংটন হিলটন’ হোটেলে আয়োজিত বার্ষিক ‘হোয়াইট হাউজ করেসপনডেন্টস ডিনার’ চলাকালীন হোটেলের বাইরে বন্দুকধারী গুলি চালালে সেখানে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, ফার্স্টলেডি মেলানিয়া ট্রাম্প এবং উপস্থিত মন্ত্রিসভার সদস্যরা এ হামলায় অক্ষত রয়েছেন। ঘটনার পরপরই সিক্রেট সার্ভিসের সদস্যরা প্রেসিডেন্টকে দ্রুত অনুষ্ঠানস্থল থেকে সরিয়ে নিয়ে যান।
শনিবার স্থানীয় সময় রাত আনুমানিক ৮টা ৩৫ মিনিটে যখন ডিনার অনুষ্ঠানটি চলছিল, ঠিক তখনই হোটেলের বলরুমের প্রবেশপথের কাছে একটি নিরাপত্তা চেকপয়েন্টে গোলাগুলি শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, প্রায় পাঁচটি গুলির শব্দ শোনা যায় এবং বারুদ পোড়া গন্ধ বলরুমের ভেতর পর্যন্ত পৌঁছেছিল। গুলির শব্দ শোনামাত্রই বলরুমের ভেতরে থাকা প্রায় ২,৬০০ অতিথির মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ট্রাম্প ও তার স্ত্রী মঞ্চে বসে থাকা অবস্থায় হট্টগোল শুরু হলে উপস্থিত সাংবাদিক ও কর্মকর্তারা টেবিলের নিচে আশ্রয় নিচ্ছেন। এ সময় সশস্ত্র সিক্রেট সার্ভিস সদস্যরা মঞ্চ ঘিরে ফেলেন এবং ট্রাম্পকে নিরাপদে সরিয়ে নেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, অনেককে ‘নিচে শুয়ে পড়ুন’ বলে চিৎকার করতে শোনা যায় এবং কেউ কেউ ‘ইউএসএ, ইউএসএ’ স্লোগান দিতে থাকেন।
সন্দেহভাজন আটক ও তদন্ত হামলার পরপরই সিক্রেট সার্ভিসের সদস্যরা সন্দেহভাজন হামলাকারীকে মোকাবেলা করেন এবং তাকে হেফাজতে নেন। আলজাজিরা ও রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, হামলাকারীর নাম কোল টমাস অ্যালেন (৩১)। তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার টরেন্সের বাসিন্দা এবং পেশায় একজন শিক্ষক বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওয়াশিংটনের অন্তর্বর্তীকালীন পুলিশ প্রধান জেফরি ক্যারল জানিয়েছেন, হামলাকারীর কাছে একটি শর্টগান, একটি হ্যান্ডগান এবং একাধিক ছুরি ছিল। সিক্রেট সার্ভিসের চেকপয়েন্টে হামলার সময় একজন কর্মকর্তা গুলিবিদ্ধ হন। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, ওই কর্মকর্তা বুলেটপ্রুফ ভেস্টের কারণে প্রাণে বেঁচে গেছেন এবং বর্তমানে তিনি শঙ্কামুক্ত।
ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর হোয়াইট হাউজে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প অংশ নেন। এ সময় তার সাথে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। ট্রাম্প হামলাকারীকে একজন ‘অত্যন্ত অসুস্থ ব্যক্তি’ এবং ‘ঠগ’ হিসেবে অভিহিত করেন, যে মার্কিন সংবিধানের ওপর আঘাত হেনেছে। তিনি বলেন, “আপনারা জানেন, গত কয়েক বছরে আমাদের প্রজাতন্ত্রে এটিই প্রথম কোনো আততায়ী হামলার ঘটনা নয়। তবে আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, আমরা এসবের কারণে কোনো অনুষ্ঠান বাতিল করব না।” ট্রাম্প পরে তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোস্যাল’-এ সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করেন, যেখানে দেখা যায় সন্দেহভাজন ব্যক্তি নিরাপত্তা বেষ্টনী অতিক্রম করে দ্রুত দৌড়াচ্ছে এবং নিরাপত্তা কর্মীরা অস্ত্র তাক করছেন।
কলম্বিয়া ডিস্ট্রিক্টের ইউএস অ্যাটর্নি জেনিন ফেরিস পিরো জানিয়েছেন, সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে বিপজ্জনক অস্ত্র ব্যবহার করে ফেডারেল কর্মকর্তাদের ওপর হামলা এবং অপরাধমূলক কাজে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ আনা হবে। এফবিআই পরিচালক কাশ প্যাটেল জানান, তারা গুরুত্বের সাথে হামলাকারীর অতীত ইতিহাস খতিয়ে দেখছেন এবং জনগণের কাছে প্রাসঙ্গিক তথ্য চেয়েছেন। এ দিকে এই ন্যক্কারজনক হামলার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এবং মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শেইনবাম এ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী মোদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) বলেন, “গণতন্ত্রে সহিংসতার কোনো স্থান নেই এবং একে দ্ব্যর্থহীনভাবে নিন্দা জানানো উচিত।”
উল্লেখ্য, যে হোটেলে এই হামলার ঘটনা ঘটেছে, ১৯৮১ সালে সেখানেই প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান আততায়ীর গুলিতে আহত হয়েছিলেন। ট্রাম্পের ওপর এর আগেও একাধিকবার প্রাণঘাতী হামলার চেষ্টা করা হয়েছে। ২০২৪ সালে পেনসিলভানিয়ার বাটলারের নির্বাচনী প্রচারণায় থমাস ক্রুকস তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিলেন, যা তার কানে আঘাত হেনেছিল। সাম্প্রতিক এসব হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্প ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরো জোরদার করার দাবি জোরালো হচ্ছে। ট্রাম্প নিজেও সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “বর্তমানে আমাদের এমন এক স্তরের নিরাপত্তা প্রয়োজন যা আগে কেউ কখনো দেখেনি।” হামলার জেরে অনুষ্ঠানটি স্থগিত করা হলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তা দ্রুত পুনরায় আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছেন।