ইসরাইলি হামলার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে গাজার চিকিৎসকরা

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • নিখোঁজ স্বজনদের অপেক্ষায় পরিবার

  • গাজায় নিহত বেড়ে ৭২,২৮৫

  • গাজায় ইউএনআরডব্লিউএর ৩৯০ কর্মী নিহত

  • পশ্চিমতীরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা, ফিলিস্তিনিদের ওপর ‘পদ্ধতিগত চাপ’: জাতিসঙ্ঘ

গাজায় ইসরাইলি হামলায় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর ধারাবাহিক আক্রমণ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। জাতিসঙ্ঘের এক সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গাজায় চিকিৎসা খাতকে লক্ষ্য করে যে হামলা চালানো হয়েছে, তা কেবল একটি যুদ্ধ কৌশল নয়, বরং দায়মুক্তির একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। খবর আলজাজিরার।

তিনি জানান, গত বছর রাফাহ এলাকায় নিখোঁজ হওয়া ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মীদের পরে একটি গণকবরে উদ্ধার করা হয়। তারা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত মেডিক্যাল ইউনিফর্ম ও অ্যাম্বুলেন্সে ছিলেন, তবুও তাদের হত্যা করা হয়। তদন্তের পর ইসরাইলি সেনাবাহিনী সীমিত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিলেও কোনো ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়নি। এ ছাড়া ছয় বছর বয়সী হিন্দ রাজাবকে উদ্ধারে যাওয়া চিকিৎসকরাও হামলার শিকার হন, যদিও আগে থেকেই সমন্বয় করা ছিল। এ ধরনের ঘটনার মাধ্যমে দেখা যায়, চিকিৎসাসেবা প্রদানকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক নিয়ম কার্যকরভাবে মানা হচ্ছে না। গাজায় হাসপাতালগুলোও বারবার হামলার শিকার হয়েছে। আল-শিফা, নাসের ও ইন্দোনেশিয়ান হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো ধ্বংস বা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এতে গুরুতর আহত রোগীদের চিকিৎসা পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই হামলাগুলো শুধু অবকাঠামো ধ্বংস নয়, বরং একটি জনগোষ্ঠীর বেঁচে থাকার মৌলিক ব্যবস্থাকে ভেঙে দেয়ার অংশ। খাদ্য, পানি, চিকিৎসা ও আশ্রয়-সবকিছুর ওপর আঘাত হানার ফলে গাজার মানুষের জীবন আরো অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য খাতে হামলা বেড়েছে, তবে গাজায় এর মাত্রা সবচেয়ে গুরুতর। একই ধরনের হামলা লেবাননেও ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে শতাধিক চিকিৎসাকর্মী নিহত হয়েছেন এবং বহু হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

নিখোঁজ স্বজনদের অপেক্ষায় পরিবার

গাজায় চলমান সঙ্ঘাতের মধ্যে নিখোঁজ স্বজনদের নিয়ে অনিশ্চয়তা ও দুঃসহ অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছে বহু পরিবার। খান ইউনুসের বাসিন্দা তাহরির আবু মাদির গল্প সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। খবর আলজাজিরার। তাহরিরের ২০ বছর বয়সী মেয়ে মালাক, যিনি একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও স্বেচ্ছাসেবী নার্স ছিলেন, ২০২৪ সালে ইসরাইলি অভিযানের সময় নিখোঁজ হন। একই সাথে হারিয়ে যান তার ছেলে ইউসুফও। পরে ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষের ভিত্তিতে মালাকের মৃত্যু সনদ দেয় গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, তবে ইউসুফের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

কিন্তু কয়েক মাস পর পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। মুক্তিপ্রাপ্ত ফিলিস্তিনি বন্দীদের একটি তালিকায় মালাকের নাম পাওয়া যায়, যেখানে তার অবস্থান সম্পর্কে ‘কোনো তথ্য নেই’ উল্লেখ করা হয়। এতে তাহরিরের অনিশ্চয়তা আরো গভীর হয়-কারণ, মেয়ে আসলেই নিহত, নাকি কোথাও আটক আছেন, তা স্পষ্ট নয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, গাজা থেকে হাজারো মানুষকে আটক করা হয়েছে, যাদের অনেকের অবস্থান অজানা। অনেক পরিবারই এমন দ্বিধা ও দুঃখের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে, যেখানে প্রিয়জনের মৃত্যু নিশ্চিত নয়, আবার জীবিত থাকার প্রমাণও নেই। এই পরিস্থিতিতে তাহরির এখনও অপেক্ষা করছেন- মেয়ে মালাক একদিন ফিরে আসবে, এই আশায়।

ইসরাইলি হামলায় নিহত বেড়ে ৭২,২৮৫

অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি বাহিনীর বর্বরোচিত হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭২ হাজার ২৮৫ জনে দাঁড়িয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘাত এখন এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে। ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফার বরাতে চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৫৪৮ দিনের নিরবচ্ছিন্ন হামলায় এ পর্যন্ত অন্তত এক লাখ ৭২ হাজার ২৮ জন ফিলিস্তিনি গুরুতর আহত হয়েছেন। শুধুমাত্র সোমবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টাতেই ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত পাঁচজন এবং আহত হয়েছেন আরো ১৪ জন। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, গত ১১ অক্টোবর ঘোষিত ‘যুদ্ধবিরতি’র পর থেকেও গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসন থামেনি।

ইউএনআরডব্লিউএর ৩৯০ কর্মী নিহত

জাতিসঙ্ঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থার (ইউএনআরডব্লিউএ) প্রধান ফিলিপ লাজারিনি ইসরাইলের নতুন মৃত্যুদণ্ড আইন নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। জেনেভায় এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ফিলিস্তিনি বন্দীদের লক্ষ্য করে আনা এই আইন তাকে ‘স্তম্ভিত’ করেছে এবং এটি বৈষম্যমূলক। লাজারিনি বলেন, গণতান্ত্রিক দেশগুলো সাধারণত মৃত্যুদণ্ড বাতিলের দিকে যায়, কিন্তু এই আইন একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করছে, যা মানবাধিকারের পরিপন্থী। খবর আনাদোলু এজেন্সির।

তিনি জানান, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় শুরু হওয়া ইসরাইলি আগ্রাসনে ইউএনআরডব্লিউএর ৩৯০ জনের বেশি কর্মী নিহত হয়েছেন, যা সংস্থাটির ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী সঙ্ঘাত। এ ঘটনায় একটি স্বাধীন উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে এবং বিষয়টি জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব ও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সাথে আলোচনা চলছে। লাজারিনি আরো বলেন, গাজায় ইউএনআরডব্লিউএর ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। পূর্ব জেরুসালেমে সংস্থাটির কার্যক্রম বন্ধে আইন পাস, স্কুল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ করে দেয়া এবং বিদ্যুৎ-পানি বিচ্ছিন্ন করার মতো পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডকে তিনি নজিরবিহীন বলে উল্লেখ করেন।

পশ্চিমতীরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা, ফিলিস্তিনিদের ওপর ‘পদ্ধতিগত চাপ’: জাতিসঙ্ঘ

অধিকৃত পশ্চিমতীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের বাড়তে থাকা হামলা ফিলিস্তিনিদের নিজভূমি ছাড়তে বাধ্য করার একটি ‘পদ্ধতিগত চাপ’ তৈরি করছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসঙ্ঘ। জাতিসঙ্ঘের মুখপাত্র স্টেফান দুজারিক জানান, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হামলার সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। তিনি বলেন, গাজায় বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণের পাশাপাশি পশ্চিমতীরেও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে। খবর আনাদোলু এজেন্সির। সম্প্রতি হেবরনের কাছে বসতি স্থাপনকারীরা দু’টি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। স্থানীয়রা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলেও এ ধরনের হামলা এখন প্রায় নিয়মিত হয়ে উঠেছে। দুজারিক বলেন, এসব হামলা ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য করছে এবং মানবিক সঙ্কট আরো গভীর করছে। জাতিসঙ্ঘ জানিয়েছে, এসব হামলায় প্রাণহানি, আহত এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। তাই এ ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়েছে।