চলতি অর্থবছরেই রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলারে নেয়ার ল্য : গভর্নর

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

চলতি অর্থবছরের মধ্যেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার ল্য নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, রিজার্ভ বাড়াতে আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ধার নেয়ার প্রয়োজন নেই। নিজস্ব উৎস থেকেই রিজার্ভ বাড়াতে হবে। আমরা চাপ সৃষ্টি করে ডলার কিনছি না। বাজারভিত্তিক অকশনের মাধ্যমেই ডলার কেনা হচ্ছে। অর্থবছর শেষে রিজার্ভ ৩৪ থেকে ৩৫ বিলিয়ন ডলারে নেয়ার ল্য রয়েছে।

গতকাল রাজধানীতে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত ‘ব্যাংকিং খাত সংস্কার : চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক আলোচনায় এসব কথা বলেন তিনি। গভর্নর বলেন, ‘আমরা একটি খারাপ অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে উন্নতির পথে যাচ্ছি। ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরানো হয়েছে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা এসেছে। ব্যালান্স অব পেমেন্ট বা ডলার পরিস্থিতি নিয়ে এখন কোনো উদ্বেগ নেই।

তবে ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের সমস্যার কথাও স্বীকার করেন তিনি। গভর্নর বলেন, অনেক ব্যাংকে মূলধন ঘাটতি রয়েছে এবং খেলাপি ঋণের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ‘আমার ধারণা ছিল খেলাপি ঋণ ২৫ থেকে ২৭ শতাংশ হবে; কিন্তু বাস্তবে তা প্রায় ৩৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আমরা কোনো তথ্য লুকাবো না। যা সত্য, সেটাই প্রকাশ করা হবে।’

ব্যাংক সংস্কারের অংশ হিসেবে পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ সম্পর্কেও জানান গভর্নর। আমানতকারীদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, ‘একীভূত ব্যাংকগুলোর আমানত নিরাপদ থাকবে। আমানত বীমার আওতায় দুই লাখ টাকা পর্যন্ত সুরা দেয়া হবে। নতুন ব্যাংকে ২০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হলে সেখানে লোকসানের কোনো সম্ভাবনা নেই।’

আলোচনায় মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের মূল কাজের বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে জড়িয়েছে। ক্যাপিটাল মার্কেট কার্যকর না থাকায় ব্যাংকগুলোকে সেই দায়িত্ব নিতে হয়েছে, যার মাধ্যমে শিল্পায়নও হয়েছে।’ তবে তিনি বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংক দখলের পর থেকেই ব্যাংকিং খাতে মাফিয়াতন্ত্রের সূচনা হয়, আর সেখান থেকেই সঙ্কট ঘনীভূত হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংকিং খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। রিজার্ভ আবার বাড়ছে, ডলার বাজারে অস্থিরতা কমেছে এবং বাজারভিত্তিক ডলার রেট চালুর পরও বড় ধরনের ঝাঁকুনি আসেনি।’ তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া শুধু ব্যাংকিং ব্যবস্থা সংস্কার করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না বলেও মত দেন তিনি।

একই অনুষ্ঠানে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘এক সময় ব্যাংকিং খাত উদ্যোক্তা তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে নীতিগত দুর্বলতা, রাজনৈতিক হস্তপে এবং যাচাই-বাছাই ছাড়া ঋণ দেয়ার কারণে খাতটি ধ্বংসের মুখে পড়ে।’ বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় বাজেটের সমান বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, আগে প্রকৃত চিত্র আড়াল করা হতো বলে খেলাপি ঋণের হার কম দেখানো হতো। এখন নিয়ম অনুযায়ী হিসাব করায় এই হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। সঙ্কট উত্তরণে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেয়া ব্যাংক রেজুলেশন অ্যাক্টসহ বিভিন্ন পদপেকে ইতিবাচক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এসব সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে।’

ফাহমিদা খাতুন জোর দিয়ে বলেন, ব্যাংকিং খাত ঘুরে দাঁড়াতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে হবে। অতীতে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের কারণেই খাতটি আজ এই অবস্থায় পৌঁছেছে। তিনি আরো বলেন, সামনে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে ব্যাংকিং খাত নিয়ে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার থাকা জরুরি।