বীরে শিফা : আধ্যাত্মিক কূপ দর্শন : ফাত্তাহ তানভীর রানা

Printed Edition
pas-2
বীরে শিফা : আধ্যাত্মিক কূপ দর্শন : ফাত্তাহ তানভীর রানা

ইসলামের ইতিহাসে বদরের যুদ্ধ হলো- মদিনার মুসলিম ও মক্কার কুরাইশদের মধ্যে সংঘটিত প্রথম ও সবচেয়ে বড় যুদ্ধ। ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে (২ হিজরি, ১৭ রমজান) সংঘটিত এ যুদ্ধে ৩১৩ জন মুসলিম ও ১০০০ কুরাইশ অংশ নিয়েছিল। মুসলিমদের সাহায্য করার জন্য আল্লাহ তায়ালা বদরের যুদ্ধে ফেরেশতা পাঠিয়েছিলেন। কুরআনে (সূরা আলে-ইমরান, ১২৪-১২৫) স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, ফেরেশতারা সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলমানদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করেন।

একটা চাপা উত্তেজনা কাজ করছে। নতুন স্থান আর সব কিছুই নতুন। বদরযুদ্ধ মানুষের মুখে কিংবদন্তিতুল্য। সেখান থেকেই মূলত শুরু হয় ইসলামের যাত্রা। বদরযুদ্ধ প্রান্তরে যাচ্ছি! নিজ চোখে দেখতে যাচ্ছি। গাড়িতে যাওয়ার সময় দেখছি দু’পাশেই পাহাড় আর পাহাড়! পাথুরে এসব পাহাড়ে নেই কোনো সবুজের ছোঁয়া, তবুও অনেক সুন্দর। হঠাৎ, গাড়ি দাঁড়িয়ে গেল। মোয়াল্লেম জাকারিয়া হুজুর, গাড়ি থেকে নামতে বলেন। অবশ্য এর আগে তিনি বীরে শিফার ইতিহাস সম্পর্কে আমাদের একটা সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিলেন। আমরা গাড়ি থেকে নেমে যাই বীরে শিফার উদ্দেশে। বীরে শিফা একটি দূষিত ও লবণাক্ত পানির কূপ ছিল। যা মদিনা থেকে প্রায় ১০২ কিলোমিটার দূরে বদর যুদ্ধস্থলের কাছাকাছি অবস্থিত। বীরে শিফার ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব রয়েছে। মহানবী হজরত মোহাম্মদ সা:-এর বরকতময় থুথু মোবারকের স্পর্শে কূপের পানি মিষ্টি ও কল্যাণকর হয়ে ওঠে। তখন থেকে কূপকে আরোগ্য বা শিফা (আরোগ্য) প্রদানের কূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বীরে শিফা কূপকে জমজম কূপের পর পৃথিবীর সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও স্বাস্থ্যকর কূপ হিসেবে মনে করা হয়। বীরে শিফা নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এর মহিমা। আরবি ‘বির’ অর্থ কুয়া এবং ‘শিফা’ অর্থ নিরাময় বা আরোগ্য। মরু অঞ্চলে পানি পাওয়া বড়ই দুষ্কর। বদরযুদ্ধ শেষে মহানবী সা: এবং তাঁর সাহাবিরা মদিনায় ফিরে আসার পথে সফর ও যুদ্ধের ধকলে ক্লান্ত। কাফেলায় তখন চলছিল পানির সঙ্কট। সাহাবায়ে কেরাম পিপাসায় অস্থির হয়ে পড়েছিলেন। কিছু সাহাবি অসুস্থতাও অনুভব করছিলেন। তখন সাহাবায়ে কেরামরা রাসূলুল্লাহ সা:-এর কাছে পানির সঙ্কট ও পিপাসার কথা জানালেন। তখন হজরত মোহাম্মদ সা: পাথরের ওপর বসেছিলেন। পাথরের পাশেই একটি কূপ ছিল, সাহাবায়ে কেরাম সেই কূপ থেকে পানি উত্তোলন করেন। কূপের পানি মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ত ছিল। বিষয়টি মহানবী সা:-কে জানানো হলে, তিনি কুয়ার পাশে পাথরের ওপর বসে মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন। রাসূল সা: নিজের থুতু মোবারক কূপের মধ্যে নিক্ষেপ করলেন। সাথে সাথে কূপের গভীরে থাকা পানি অনেকটা ওপরে উঠে আসে। পানি পান করে দেখা যায়, লবণাক্ত পানি সুমিষ্ট পানিতে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। কূপের পানি পান করতেই সাহাবায়ে কেরাম সতেজতা ও সুস্থতা অনুভব করলেন। তখন থেকেই বীরে শিফা কুয়া ‘শিফা’ বা আরোগ্যের প্রতীক হিসেবে লাভ করে। মদিনা থেকে দূরত্বের কারণে বীরে শিফা একটি নির্জন ও শান্ত এলাকা। আজও অনেকে রোগমুক্তির আশায় কুয়ার পানি সংগ্রহ করেন। বহুকাল ধরেই বীরে শিফা মানুষের কাছে বিশ্বাস ও আস্থার প্রতীক হয়ে রয়েছে। দর্শনার্থীরা এই কুয়ার পানি সংগ্রহ করে তা বোতলে ভরে দেশে নিয়ে যান। বীরে শিফার পানি পান করে তারা শুধু পিপাসা মেটায় কি? এই পানি তাদের মধ্যে আধ্যাত্মিক শান্তি ও প্রশান্তি নিয়ে আসে। ‘বীরে শিফা’ কূপ সম্পর্কিত ঘটনাটি বিভিন্ন সিরাত ও ইতিহাস গ্রন্থে পাওয়া বর্ণনার অংশ। হ

লেখক : ব্যাংকার ও গল্পকার