পদত্যাগ করা ২ ছাত্র উপদেষ্টার গন্তব্য কোথায়

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

নানা গুঞ্জন আলোচনার পর অবশেষে অন্তর্বর্তী সরকারে সমাপ্তি ঘটল দুই ছাত্র উপদেষ্টার অধ্যায়ের। প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম দুই মুখ, তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলম এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় এবং যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। গত বুধবার সন্ধ্যায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন তারা। এর মধ্য দিয়ে সরকারের নির্বাহী বিভাগ থেকে সরে গিয়ে সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতিতে নামার পথ সুগম করলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এই দুই শীর্ষ নেতা।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার ঠিক আগমুহূর্তে এই পদত্যাগ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে পদত্যাগের পর তাদের পরবর্তী রাজনৈতিক গন্তব্য কোথায়, তা নিয়ে চলছে তুমুল বিশ্লেষণ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, জুলাই আন্দোলনের সহযোদ্ধাদের গড়া দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি)-ই হতে যাচ্ছে তাদের পরবর্তী ঠিকানা। তবে সেখানেও রয়েছে পদ-পদবি ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে নানা টানাপড়েন ও সমীকরণ।

পদত্যাগের নেপথ্য : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়েছে গতকাল। নির্বাচনকালীন সরকারে থেকে নির্বাচনে অংশ নিলে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, মূলত এই নৈতিক অবস্থান থেকেই দুই উপদেষ্টাকে সরে দাঁড়াতে হলো। তবে এই সরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়াটি মসৃণ ছিল না, বিশেষ করে মাহফুজ আলমের ক্ষেত্রে।

সরকারি এবং রাজনৈতিক নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে, পদত্যাগে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না ‘মাস্টারমাইন্ড’ খ্যাত উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। তিনি চেয়েছিলেন নির্বাচন না করে সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত বা ক্ষমতা হস্তান্তর পর্যন্ত উপদেষ্টা হিসেবেই দায়িত্ব পালন করতে। এমনকি মঙ্গলবার মধ্যরাতেও তিনি তার ঘনিষ্ঠজনদের কাছে সরকারে থেকে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। কিন্তু সরকারের শীর্ষ পর্যায় এবং প্রধান উপদেষ্টার দফতর থেকে স্পষ্ট বার্তা দেয়া হয়, নির্বাচনে অংশ নিতে হলে বা দলীয় রাজনীতি করতে হলে সরকারের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে তাদের পদত্যাগ বাঞ্ছনীয়। শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন পক্ষের পরামর্শ এবং পরিস্থিতির চাপে বুধবার সকালে তিনি পদত্যাগে সম্মত হন।

অন্যদিকে, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া শুরু থেকেই তার রাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষা ও নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়ে স্পষ্ট ছিলেন। তিনি তফসিল ঘোষণার আগেই পদত্যাগ করে নির্বাচনী মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। গতকাল সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি নিজেও নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

গন্তব্য কি এনসিপি : পদত্যাগের পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, তারা কি জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) যোগ দিচ্ছেন? এনসিপি এবং দুই উপদেষ্টার ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, নীতিগতভাবে তারা এনসিপিতে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তবে চূড়ান্ত ঘোষণার আগে দলের অভ্যন্তরে ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে চলছে দর কষাকষি।

সম্প্রতি তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের সরকারি বাসভবনে এনসিপির শীর্ষ নেতাদের সাথে আসিফ মাহমুদ ও মাহফুজ আলমের একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দলের আগামী দিনের কৌশল, নির্বাচন এবং এই দুই হেভিওয়েট ছাত্রনেতার দলে যোগদানের প্রক্রিয়া নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়।

সূত্র জানায়, আসিফ ও মাহফুজ দু’জনই দলে যোগ দিলে শীর্ষস্থানীয় ও সম্মানজনক পদ দাবি করেছেন। তারা চান নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের কর্তৃত্ব বজায় থাকুক। তবে এনসিপির বর্তমান কাঠামোতে তাদের কিভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, তা নিয়ে দলের ভেতরে কিছুটা অস্বস্তি ও টানাপড়েন রয়েছে। এনসিপির বিদ্যমান নেতৃত্ব কাঠামোতে তাদের সরাসরি শীর্ষ পদে বসানো হবে, নাকি নতুন কোনো পদ সৃষ্টি করা হবে, তা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি।

এনসিপির একটি সূত্র নয়া দিগন্তকে জানিয়েছে, তাদের জন্য দলের গঠনতন্ত্র মেনে সম্মানজনক কোনো পদ সৃষ্টি করা হতে পারে। এমনকি আগামী কাউন্সিলের মাধ্যমেও তাদের নেতৃত্বে আনা হতে পারে।

এনসিপির সদস্যসচিব এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, এনসিপিতে আমরা সম্মিলিতভাবেই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করি। আমরা এই দু’জনের ব্যক্তিগত মতামতকে শ্রদ্ধা জানাই। তারা যদি এনসিপির সাথে যুক্ত হন, আমরা তাদের সাদরে গ্রহণ করব।

তবে দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন এবং যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার জানিয়েছেন, বিষয়টি এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে এবং এটি পুরোপুরি ওই দুই নেতার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। এনসিপির প্রথম ধাপের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। যেখানে প্রাথমিকভাবে তাদের নাম নেই। তবে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা হলে চূড়ান্ত তালিকায় তাদের নাম যুক্ত হতে পারে।

বিএনপির সাথে জোটের গুঞ্জনে ভাটা ও নতুন সমীকরণ : রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন ছিল, দুই ছাত্র উপদেষ্টা হয়তো বিএনপির সাথে কোনো ধরনের সমঝোতা বা জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশ নেবেন। এমনকি এনসিপিকে বিএনপির জোটে ভেড়ানোর একটি চেষ্টাও ছিল। লক্ষ্য ছিল- ঢাকা-১০ ও লক্ষ্মীপুর-১ আসনে বিএনপির সমর্থন আদায় করা। কিন্তু সেই সমীকরণ এখন অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে।

বিএনপি এরই মধ্যে ঢাকা-১০ আসনে শেখ রবিউল আলম এবং লক্ষ্মীপুর-১ আসনে শাহাদাত হোসেন সেলিমকে (এলডিপি থেকে আসা) দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে। আসন সমঝোতা না হওয়ায় বিএনপির জোটে এনসিপির যোগ দেয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। ফলে আসিফ ও মাহফুজকে এখন এনসিপির ব্যানারে বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেই লড়তে হবে। বিশেষ করে মাহফুজ আলম জামায়াতের সাথে এনসিপির যেকোনো সমঝোতার বিরোধী হওয়ায় বিএনপির সাথে জোট গড়ার পথ আরো সঙ্কুচিত হয়েছে।

আসিফ মাহমুদ ও ঢাকা-১০ : উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের চোখ ঢাকা-১০ আসনের দিকে। ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, কলাবাগান ও হাজারীবাগ নিয়ে গঠিত এই ভিআইপি আসনটি জাতীয় রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আসিফ মাহমুদ গত ৯ নভেম্বর এই আসনের ভোটার হওয়ার আবেদন করেন এবং গতকাল সংবাদ সম্মেলনে নিশ্চিত করেছেন যে তিনি ঢাকা থেকেই নির্বাচন করবেন।

আসিফ বলেন, যেহেতু ঢাকা থেকে নির্বাচন করব এটি মোটামুটি নিশ্চিত, সেই জায়গা থেকে নিজের ভোটটাও ঢাকায় নিয়ে আসা। ভোটটা যাতে অপচয় না হয়। আমি ভোটার হওয়ার পর দু’টি নির্বাচন হয়েছে- ২০১৮ ও ২০২৪ সালে। সে সময় কেউই ভোট দিতে পারেনি।

আসিফ মাহমুদের পৈতৃক নিবাস কুমিল্লার মুরাদনগরে (কুমিল্লা-৩) হলেও তিনি সেখান থেকে নির্বাচন করবেন না বলে আগেই জানিয়েছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্র রাজনীতির অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি ঢাকা-১০ আসনটি বেছে নিয়েছেন। এনসিপি সূত্রমতে, তিনি এরই মধ্যে এই এলাকার থানাগুলোতে নিজ অনুসারীদের দিয়ে কমিটি গোছানোর কাজ শুরু করেছেন।

মাহফুজ আলম ও লক্ষ্মীপুর-১ : অন্য দিকে মাহফুজ আলমের নির্বাচনী পরিকল্পনা লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসন ঘিরে। যদিও তিনি প্রকাশ্যে এখনো নির্বাচনের ঘোষণা দেননি, তবে এনসিপি তার জন্য এ আসনটি খালি রেখেছে। গতকাল বিকেলে তিনি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হেয়ার রোডের বাসায় ডেকে বিদায় জানিয়েছেন, যা তার নির্বাচনী প্রস্তুতিরই অংশ বলে মনে করা হচ্ছে। তবে বিএনপির প্রার্থী ঘোষণা হয়ে যাওয়ায় এ আসনে লড়াইটা তার জন্য চ্যালেঞ্জিং হবে।

আগামীর পথচলা : গতকাল বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে শেষবারের মতো যোগ দেন পদত্যাগী দুই উপদেষ্টা। এর পরই তাদের পদত্যাগ কার্যকর হবে এবং শূন্য তিন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব বর্তমান উপদেষ্টাদের মধ্যে বণ্টন করা হবে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে তরুণ নেতৃত্বের উত্থান হয়েছিল, তারা এখন রাষ্ট্র পরিচালনার সংক্ষিপ্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে সরাসরি ভোটের রাজনীতিতে প্রবেশ করছেন। এনসিপির সাথে তাদের চূড়ান্ত সংযুক্তি এবং নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া- এই দুই চ্যালেঞ্জই এখন তাদের সামনে। ভোটাররা ‘মাস্টারমাইন্ড’ মাহফুজ ও ‘লড়াকু’ আসিফকে ব্যালট পেপারে কিভাবে গ্রহণ করবেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে এটি নিশ্চিত, তাদের এ সিদ্ধান্ত আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের মধ্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।