সূচকের উত্থানের পর পুঁজিবাজারে স্বাভাবিক সংশোধন

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

পুঁজিবাজারে ফের সংশোধন ঘটেছে। সপ্তাহের শেষ কর্মদিবস বৃহস্পতিবার এ সংশোধনের শিকার হয় দেশের উভয় শেয়ারবাজার। এর আগে মঙ্গলবার ও বুধবার টানা দুই দিন দুই বাজারেই সূচকের বড় উন্নতি হয়েছিল। দুই দিনের এই উত্থানের পর স্বাভাবিক নিয়মেই বৃহস্পতিবার বাজারে সংশোধন দেখা দেয়। এ দিন উভয় বাজারেই লেনদেন হওয়া কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর বেশির ভাগের দরপতন ঘটে। সূচকের অবনতির কারণে বিনিয়োগকারীরা সতর্ক অবস্থান নেয়ায় লেনদেনের পরিমাণও কমে আসে।

সূচকের উন্নতির মধ্য দিয়ে বৃহস্পতিবার লেনদেন শুরু করে দুই পুঁজিবাজার। ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেনের আধঘণ্টার মাথায় প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২০ পয়েন্টের বেশি বেড়ে ৫ হাজার ১৯৪ দশমিক ৭০ পয়েন্টে পৌঁছায়। তবে এ সময় বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হলে সূচকটি নিম্নমুখী হতে শুরু করে।

বেলা সোয়া ১১টার দিকে সূচকটি নেমে আসে ৫ হাজার ১৫৫ পয়েন্টে; অর্থাৎ শুরুতে যে সূচক ২০ পয়েন্ট বেড়েছিল, তা এ পর্যায়ে ১৯ পয়েন্টের বেশি হারায়। পরে বিক্রয়চাপ কিছুটা সামলে সূচকটি আবার ঊর্ধ্বমুখী হয় এবং বেলা ১টার পর হারানো সূচকের প্রায় পুরোটা ফিরে পায়। তবে বেলা দেড়টার দিকে ফের বিক্রয়চাপ বাড়লে বাজার আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।

দিন শেষে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২০ দশমিক ০৯ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ১৫৪ দশমিক ৩০ পয়েন্টে দাঁড়ায়। দিনের শুরুতে সূচকটি ছিল ৫ হাজার ১৭৪ দশমিক ৪০ পয়েন্টে। এর আগে টানা দুই দিনে সূচকটির উন্নতি হয়েছিল ৯৩ পয়েন্টের বেশি। এ দিন ডিএসইর বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ কমেছে ৭ দশমিক ০৫ পয়েন্ট এবং ডিএসই শরিয়াহ সূচক কমেছে ৪ দশমিক ৩৭ পয়েন্ট।

অন্য দিকে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) প্রধান সূচক সিএএসপিআই ৩৬ দশমিক ৭১ পয়েন্ট কমে ১৪ হাজার ৪৬৯ দশমিক ৩৭ পয়েন্টে নেমে আসে। দিনের শুরুতে সূচকটি ছিল ১৪ হাজার ৫০৬ দশমিক ০৮ পয়েন্টে। সিএসইর বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স যথাক্রমে ৬৪ দশমিক ০৪ ও ২৫ দশমিক ৮১ পয়েন্ট কমেছে।

লেনদেন শুরুর এক ঘণ্টার মধ্যেই তৈরি হওয়া বিক্রয়চাপ বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করে তোলে। ফলে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমতে থাকে। সপ্তাহের শেষ কর্মদিবস হওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও ছিলেন বিক্রয়মুখী। এর প্রভাবে উভয় বাজারেই লেনদেনের গতি কমে যায়। ঢাকা শেয়ারবাজারে বৃহস্পতিবার ৫৫০ কোটি টাকার লেনদেন হয়, যা আগের দিনের তুলনায় ৮৩ কোটি টাকা কম। বুধবার ডিএসইতে লেনদেন হয়েছিল ৬৩৩ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে লেনদেন কমেছে প্রায় ২ লাখ টাকা।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা দিনটির বাজার পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক সংশোধন হিসেবেই দেখছেন। তাদের মতে ব্যাংক ও বীমা খাতে গত দুই দিনের মূল্যবৃদ্ধির পর বিনিয়োগকারীরা মুনাফা তুলে নেয়ায় সূচকের পতন ঘটেছে। ব্যাংকিং খাতে সংশোধন তুলনামূলক কম হলেও বীমা খাতে বড় ধরনের দরপতন দেখা গেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বীমা খাতের বেশির ভাগ কোম্পানির শেয়ারের ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধি হয়েছিল। বৃহস্পতিবার এ খাতের প্রায় ৯০ শতাংশ কোম্পানির শেয়ারের দর কমেছে। পাশাপাশি বড় মূলধনের টেলিযোগাযোগ খাতের কোম্পানি গ্রামীণফোনসহ অন্যান্য বড় মূল্যমানের কোম্পানির শেয়ারও দরপতনের শিকার হয়েছে। এর ফলে উভয় বাজারেই অধিকাংশ কোম্পানির দর কমেছে।

মতিঝিলে ডিএসইর বিভিন্ন ব্রোকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের ট্রেডিং ফোর ঘুরে বিনিয়োগকারীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সামনে জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যেকোনো সহিংস ঘটনার দ্রুত প্রভাব পড়ছে বাজারে। নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর সাথে সাথে বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা দেখা দেয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হলে এর ইতিবাচক প্রভাব বাজারে পড়বে। তবে বিপরীত পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজার নেতিবাচক প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারবে না।

ঢাকা শেয়ারবাজারে বৃহস্পতিবার লেনদেন হওয়া ৩৯৩টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ৯২টির দর বেড়েছে, ২৪৩টির দর কমেছে এবং ৫৮টির দর অপরিবর্তিত ছিল। চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে লেনদেনে অংশ নেয়া ১৯৩টি সিকিউরিটিজের মধ্যে ৬৩টির দাম বেড়েছে, ১০৬টির কমেছে এবং ২৪টির দর অপরিবর্তিত ছিল।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে বৃহস্পতিবার লেনদেনের শীর্ষে ছিল প্রকৌশল খাতের ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস। কোম্পানিটির ৬৬ লাখ ৭৪ হাজার শেয়ার লেনদেন হয়ে মোট লেনদেন দাঁড়ায় ১৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল ওষুধ ও রসায়ন খাতের স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, যার আট লাখ ৪৪ হাজার শেয়ার লেনদেন হয়ে মোট ১৮ কোটি ৫০ লাখ টাকার বেচাকেনা হয়।

লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো হলো- সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স, লাভোলো আইসক্রিম, ইবনে সিনা ফার্মা, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, সিটি ইন্স্যুরেন্স, এডিএন টেলিকম ও ট্রাস্ট ব্যাংক।

মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষে ছিল ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস, যার দর ১০ শতাংশ বেড়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের দর বেড়েছে ৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ। মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ দশে অন্য কোম্পানিগুলো হলো- প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স, তিতাস গ্যাস, ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালস, ডরিন পাওয়ার, পেনিনসুলা হোটেল, ইসলামিক ফিন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, নাভানা ফার্মা ও জিকিউ বলপেন ইন্ডাস্ট্রিজ।

অন্য দিকে দরপতনের শীর্ষে ছিল আর্থিক খাতের কোম্পানি ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স, যার দর কমেছে ১০ দশমিক ৬২ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা এফএএস ফিন্যান্সের দর কমেছে ১০ দশমিক ১৪ শতাংশ। দরপতনের শীর্ষ দশে অন্য কোম্পানিগুলো হলো- পিপলস লিজিং, প্রিমিয়ার লিজিং, ফার ইস্ট ফিন্যান্স, এক্সিম ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, এনার্জি প্যাক পাওয়ার জেনারেশন, আরগন ডেনিমস ও লুবরেফ বাংলাদেশ।