কর্ণফুলীতে আ’লীগ-বিএনপি নেতার প্রভাব বিস্তারে এলাকাবাসীর প্রশ্ন
চোরাই তেলের সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় অস্থিরতা সৃষ্টি
Printed Edition
কর্ণফুলী (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় রাজনীতির পাশাপাশি ব্যবসায়িক প্রভাব বিস্তার নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আব্বাস। স্থানীয়দের অভিযোগ, জুলাই বিপ্লবের আগেই দীর্ঘ ১৬ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে দলটির প্রভাবশালী একাধিক নেতার সাথে প্রকাশ্য ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব বজায় রেখে তিনি এলাকায় নানা বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে তার এই ব্যবসায়িক অবস্থান স্থানীয়ভাবে যেমন আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তেমনি বিএনপির ভেতরেও নানা প্রশ্ন উঠছে।
জানা গেছে, ২০১০ সালে আলী আব্বাস আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী, হায়দার আলী ও আমীর আহমদের সাথে যৌথভাবে ‘কর্ণফুলী বিল্ডার্স অ্যান্ড ডেভেলপার (প্রা.) লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। নিবন্ধন নথি অনুযায়ী, আলী আব্বাসের শেয়ার ছিল চার হাজার এবং বাকি তিন আওয়ামী লীগ নেতার শেয়ার ছিল দুই হাজার করে। মোহাম্মদ আলী কর্ণফুলী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও বর্তমান সদস্য, হায়দার আলী দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং আমীর আহমদ উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ও সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান। ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সাথে একজন বিএনপি শীর্ষ নেতার এমন ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব নিয়ে তখন থেকেই স্থানীয়দের মধ্যে বিস্ময় ও ক্ষোভ বিরাজ করছিল।
গত বছরের ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা আত্মগোপনে গেলেও কর্ণফুলীতে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। স্থানীয় সূত্র জানায়, অভ্যুত্থানের পর ঝুট ব্যবসা, কারখানার বাতিল মালামাল ব্যবস্থাপনা, নদীপথে চোরাই তেল বাণিজ্য এবং ঘাট নিয়ন্ত্রণ; এসব খাতে হঠাৎ করেই আলী আব্বাসের প্রভাব বাড়তে থাকে। আগে যেসব খাত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে ছিল, সেগুলোর একটি বড় অংশ এখন তার দখলে চলে গেছে বলে অভিযোগ।
ফোর এইচ গ্রুপের একটি চিঠি অনুযায়ী, গত বছরের ২৭ আগস্ট তাদের দু’টি তৈরী পোশাক কারখানা, ‘ব্যালামি টেক্সটাইলস লিমিটেড’ ও ‘ডিভাইন ইন্টিমেটস লিমিটেড’-এর ঝুট ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আলী আব্বাসকে দেয়া হয়। পাশাপাশি ‘ইন্টিমেটস ইলাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’-এর বাতিল মালামালও তার তত্ত্বাবধানে দেয়া হয়। যদিও নথিতে যৌথ ব্যবস্থাপনার কথা উল্লেখ রয়েছে, স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি বাস্তবে পুরো নিয়ন্ত্রণ আলী আব্বাসের হাতেই।
বিএনপি ঘনিষ্ঠ একাধিক ব্যবসায়ী জানান, এসব কারখানায় মাসে প্রায় ২০ লাখ টাকার ঝুট কেনাবেচা হয়, যার বড় অংশ এখন এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। একই সাথে নদীপথে চোরাই তেল বাণিজ্য ও ঘাটের দখল নিয়েও উত্তেজনা বাড়ে। পুলিশ ও রাজনৈতিক সূত্র জানায়, গত ২৮ মে জুলধা এলাকার বিওসি ঘাটে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পুরনো চোরাই তেলের সিন্ডিকেটের সাথে নতুন করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় কর্ণফুলীতে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। আওয়ামী লীগ-বিএনপি রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মধ্যেও আলী আব্বাসের ক্রমবর্ধমান ব্যবসায়িক বিস্তার স্থানীয়দের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। এ বিষয়ে আলী আব্বাস অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, একটি চক্র উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য ছড়িয়ে তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করার চেষ্টা করছে।