বৈধতা পেল অন্তর্বর্তী সরকার

সুপ্রিম কোর্টের সর্বসম্মত আদেশ

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition
first-1
বৈধতা পেল অন্তর্বর্তী সরকার

সর্বসম্মত রায়- বিশ্লেষণ

  • রাষ্ট্রে অস্থিতিশীলতা এড়ানো
  • রাষ্ট্রপতির পদক্ষেপের সাংবিধানিক দায়
  • গণ-অভ্যুত্থানের জন-আন্দোলনমূলক বৈধতা
  • রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতা রক্ষা

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সর্বসম্মত আদেশ বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতাকে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিকভাবে চূড়ান্ত স্বীকৃতি দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই আদেশ শুধু একটি নির্দিষ্ট রিট খারিজ নয়- এটি বাংলাদেশের চলমান ট্রানজিশনাল কনস্টিটিউশনালিজমের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। যা রাষ্ট্রের নির্বাহী কর্তৃত্ব, বিচার বিভাগীয় ব্যাখ্যা এবং জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার সম্পর্ককে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান, প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ ও দেশত্যাগ, জাতীয় সংসদের বিলুপ্তি এবং পুরো রাষ্ট্রকাঠামোর সাময়িক শূন্যতা- এই প্রেক্ষাপটেই রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদে বিশেষ রেফারেন্স পাঠান।

১০৬ অনুচ্ছেদ-সংবিধানের ‘জরুরি ব্যাখ্যা’ অনুচ্ছেদ : এ অনুচ্ছেদটি সাধারণত অতি বিরল পরিস্থিতিতে সক্রিয় হয়- যখন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রচলিত সাংবিধানিক ধারাকে ছাড়িয়ে যায় এবং সুপ্রিম কোর্টের মতামত রাষ্ট্রের নির্বাহী সিদ্ধান্তের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। একে অনেক বিশেষজ্ঞ ‘সাংবিধানিক সুরক্ষা ভালভ’ বলে থাকেন। আন্তর্জাতিকভাবে ভারত (সাংবিধানিক প্রশ্নে প্রেসিডেন্টের রেফারেন্স), দক্ষিণ আফ্রিকা (ট্রানজিশনাল পিরিয়ড) এবং নেপালের (রাজনৈতিক খালিঘর পূরণে বিচার বিভাগীয় ব্যাখ্যা) ইতিহাসে এই ধরনের নজির রয়েছে।

হাইকোর্টের রায় : এটি জনগণের ইচ্ছায় সমর্থিত

২০২৫ সালের ১৩ জানুয়ারির ঐতিহাসিক রায়ে হাইকোর্ট বেঞ্চ বলেছিলেন ‘রাষ্ট্রপতি অনন্য পরিস্থিতিতে ১০৬ অনুচ্ছেদে মতামত নিয়েছেন। মতামত অনুযায়ী যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে, তা আইনি দলিল এবং জনগণের ইচ্ছা-উভয় দ্বারা সমর্থিত।’

এই রায় প্রথমবারের মতো গণ-অভ্যুত্থানকে একটি সংবিধানসম্মত রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। অনেক বিশেষজ্ঞ একে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন শাসনব্যবস্থায় জনগণের সার্বভৌমত্বের মতবাদের উদাহরণ বলে বিবেচনা করছেন। রিটকারী এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে লিভ টু আপিল করেন যা গতকাল আপিল বিভাগ সর্বসম্মতভাবে খারিজ করেছেন।

সুপ্রিম কোর্টের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত : রায়ের গভীর অর্থ

১. সরকারের বৈধতা নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন নেই : অ্যাটর্নি জেনারেল আসাদুজ্জামান বলেন, ‘হাইকোর্টের রায়ে কোনো ভ্রান্তি বা আইনবিরোধিতা পাননি বিচারপতিরা।’ জ্যেষ্ঠ আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘রিটের সারবত্তা রইল না। প্রকারান্তরে জনগণের ঐকমত্যের ভিত্তিতেই অন্তর্বর্তী সরকার পরিচালিত হচ্ছে- এটি প্রতিষ্ঠিত হলো।’

২. ২. উইল অব দ্য পিপল : সুপ্রিম কোর্ট রাজনৈতিক বৈধতার মূল উৎস হিসেবে জনগণকে স্থাপন করেছেন। এ বিষয়ে আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনিরের বিশ্লেষণ হচ্ছে ‘এই সরকার জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার অভিপ্রায়ের ভিত্তিতে গঠিত। আদালত সংবিধানের মূলমন্ত্রকে পুনর্ব্যক্ত করলেন।’

৩. এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ:

৪. সাধারণত রাষ্ট্রে নির্বাহী ক্ষমতার বৈধতা আসে সংবিধান থেকে

৫. কিন্তু বিশেষ পরিস্থিতিতে তা আসতে পারে জনগণের প্রত্যক্ষ ইচ্ছা থেকে

৬. এ ধারণাকে বলা হয় জনগণের সার্বভৌমত্ব থেকে সাংবিধানিক অনুমোদন। এটি ১৯৯৪ সালের দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রানজিশনাল কোর্ট রায়ের সাথে তুলনীয়।

৭. ৩. নির্বাচন, বিচার ও সংস্কার- ‘থ্রি ম্যান্ডেট’ প্রশ্নের নিষ্পত্তি : সুপ্রিম কোর্টের আদেশের ফলে নির্বাচন প্রস্তুতি, বিচার ও দায়মুক্তি পর্যালোচনা, রাষ্ট্রীয় সংস্কার (ইসি পুনর্গঠন, নিরাপত্তা বাহিনী তদারকি, সাংবিধানিক সংশোধন ইত্যাদি) এসব কর্মকাণ্ডের আইনি ভিত্তি প্রশ্নাতীত হলো।

৮. ৪. ‘সাংবিধানিক শূন্যতা’ বিতর্কের অবসান : অনেকেই যুক্তি দিয়েছিলেন, সংসদ নেই, প্রধানমন্ত্রী নেই, মন্ত্রিপরিষদ নেই- তাই এখানে সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। গতকালের রায় সেই বিতর্কের মীমাংসা করে বলে- বাংলাদেশে কোনো শূন্যতা ছিল না। রাষ্ট্রপতির প্রয়োগিত সাংবিধানিক ক্ষমতা শূন্যতা পূরণ করেছে। এটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার জন্য একটি নতুন তত্ত্ব তৈরি করে: জরুরি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার মতবাদ।

৯. এই রায়ের প্রভাব : রাষ্ট্র পরিচালনা ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ

১০. ১. নির্বাচন ২০২৬-এর প্রস্তুতি আরো দ্রুত হবে : অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় ম্যান্ডেট সুষ্ঠু নির্বাচন, সব দলের জন্য সমান সুযোগ ও নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ স্থাপন। বৈধতার বিতর্ক ওঠার সম্ভাবনা এখন নাও থাকতে পারে।

১১. ২. বিচার ও দায়মুক্তি পর্যালোচনা-আইনি চ্যালেঞ্জ কমবে : জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ড, দমন-পীড়ন, দুর্নীতি, আর্থিক অপরাধ-এগুলোর বিচার নিয়ে সরকারের যে উদ্যোগ চলছে তা এখন আরো মজবুত আইনি অবস্থানে দাঁড়াবে।

১২. ৩. নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রশাসনিক সংস্কার- বহুমাত্রিক বৈধতা পেয়েছে : অনেক সিদ্ধান্ত বিশেষ করে পুলিশ ও বিজিবির কমান্ড পরিবর্তন, দুর্নীতি তদন্ত, সিএজি, দুদকের নতুন কাঠামো, ব্যাংকিং কমিশন এসব নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও এখন আইনগত প্রশ্ন তোলার সুযোগ কমে গেল।

১৩. আন্তর্জাতিক রেফারেন্স : বাংলাদেশের নজির কেন গুরুত্বপূর্ণ

১৪. ১. ইতালি (১৯৪৬-৪৮): জনগণের ম্যান্ডেটে ট্রানজিশনাল গভর্নমেন্ট : রাজতন্ত্র পতনের পর আদালত জনগণের সাংবিধানিক ইচ্ছাকে নির্বাহী সরকারের বৈধতার প্রধান উৎস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

১৫. ২. নেপাল (২০০৬-০৮): রাজতন্ত্র পতনের পর আদালতের ক্রান্তিকালীন অনুমোদন; বিচার বিভাগ সাময়িক প্রশাসনকে জনগণের ‘সম্মিলিত রাজনৈতিক ম্যান্ডেট’ হিসেবে অভিহিত করে।

১৬. ৩. দক্ষিণ আফ্রিকা (১৯৯৪): বর্ণবাদ-পশ্চাৎ আদালতের মতামত।

১৭. ট্রানজিশনাল গভর্নমেন্টকে জনগণের ইচ্ছানির্ভর ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশের বর্তমান রায় একই ধারার অংশ- জনপ্রিয় বৈধতা ও সাংবিধানিক বৈধতা, একে আন্তর্জাতিক আইনে ‘দ্বৈত-উৎস বৈধতা’ বলা হয়।

১৮. বিচারব্যবস্থা কেন সর্বসম্মত রায় দিলো- একটি গভীর বিশ্লেষণ

১৯. ১. রাষ্ট্রে অস্থিতিশীলতা এড়ানো: দীর্ঘস্থায়ী বিচারিক অনিশ্চয়তা নতুন সঙ্কট তৈরি করত।

২০. ২. রাষ্ট্রপতির পদক্ষেপের সাংবিধানিক দায় : রাষ্ট্রপতি ক্ষমতার সীমা ছাড়াননি- বরং সাংবিধানিক শূন্যতা পূরণ করেছেন।

২১. ৩. গণ-অভ্যুত্থানের জন-আন্দোলনমূলক বৈধতা : বিচার বিভাগ এটিকে রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

২২. ৪. রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতা রক্ষা : রাষ্ট্রকে ‘রাষ্ট্রহীন মুহূর্ত’- এ পড়তে দেয়া যায় না, এটি আন্তর্জাতিক আইনেও স্বীকৃত।

২৩. সমালোচনা আছে কিন্তু তা রাজনৈতিক, আইনি নয় : বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, আদালত কি রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে অত্যধিক বৈধতা দিলো? অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ কি সীমাবদ্ধ হওয়া উচিত? বিচার বিভাগের এই ব্যাখ্যা ভবিষ্যতে আরেক ধরনের নির্বাহী ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করবে কি? তবে এসব প্রশ্ন আইনগত বৈধতা নয়, রাজনৈতিক তর্কের অংশ।

২৪. বাংলাদেশের ট্রানজিশনাল গণতন্ত্র একটি স্থিতিশীল পথ পেল : গতকালের সুপ্রিম কোর্টের আদেশ তিনটি দিক থেকেই ঐতিহাসিক। ১. আইনি বৈধতা- আদালতের সর্বোচ্চ ব্যাখ্যায় নিশ্চিত হলো, ২. রাজনৈতিক বৈধতা- জনগণের ইচ্ছাকে রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিলো, ৩. সাংবিধানিক স্থিতিশীলতা-শূন্যতার তত্ত্ব সম্পূর্ণ বাতিল হলো।

২৫. বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এখন আর কোনো আইনি বিতর্কের মুখে নেই। এখন রাষ্ট্রের সামনে প্রধান দায়িত্ব-একটি সুষ্ঠু নির্বাচন, বিচার ও দায়মুক্তি পর্যালোচনা, রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠন ও দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক স্থিতি প্রতিষ্ঠা। এ রায় বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি স্থায়ী রেফারেন্স হিসেবে থাকবে এটি নিশ্চিত।