জেআইসিতে গুমের মামলায় বীর মুক্তিযোদ্ধা ইকবাল চৌধুরীর লোমহর্ষক জবানবন্দী

তুই ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়ে এসে যুদ্ধ করে আবার ভারতের বিরুদ্ধেই কথা বলিস

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

‘তুই তো মুক্তিযোদ্ধা, কোন সেক্টরে যুদ্ধ করেছিস? তুই ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়ে এসে যুদ্ধ করে আবার ভারতের বিরুদ্ধেই কথা বলিস’ এই ধিক্কার দিয়েই শুরু হয় একাত্তরের ২ নম্বর সেক্টরের বীর মুক্তিযোদ্ধা ইকবাল চৌধুরীর ওপর অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ফেসবুকে কথা বলার অপরাধে তাকে দীর্ঘ ১১ মাস গুম করে রাখা হয় ডিজিএফআইয়ের গোপন আটককেন্দ্র ‘আয়নাঘরে’।

জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারে (জেআইসি) গুম-নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গতকাল বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অবশিষ্ট জবানবন্দী দিয়েছেন ভুক্তভোগী ইকবাল চৌধুরী। এ মামলায় মতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৩ জন আসামি রয়েছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে এই স্যাগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে গত ২ মার্চ ট্রাইব্যুনালে নিজের গুমজীবনের বীভৎস বর্ণনা দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ৭১ বছর বয়সী ইকবাল চৌধুরী। একপর্যায়ে তিনি অসুস্থ বোধ করায় প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেেিত তার স্যাগ্রহণ অসমাপ্ত রেখে আজ পর্যন্ত মুলতবি করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল।

৭১ বছর বয়সী মুক্তিযোদ্ধা ইকবাল চৌধুরী জানান, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার মতায় আসার পর বিডিআর হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড, খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া, গুম, খুন এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদ নিয়ে ফেসবুকে লেখালেখি করতেন। এর জেরে ২০১৮ সালের ৭ মে রাত আনুমানিক ১১টায় মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধের স্বপ্ননীল হাউজিংয়ের তৎকালীন ভাড়া বাসা থেকে সাত-আটজন সাদা পোশাকধারী ব্যক্তি তাকে তুলে নিয়ে যায়। তার স্ত্রী লায়লা আঞ্জুমান দরজা খুললে তারা ইকবাল চৌধুরীর পরিচয় নিশ্চিত করে এবং ‘তথ্য জানার জন্য’ অফিসে যাওয়ার কথা বলে। ৫ তলা থেকে নিচে নামানোর সময় তিনি কালো গ্লাসের সাদা রঙের মাইক্রোবাস এবং ডিবির পোশাক পরিহিত দু’জনকে দেখতে পান। গাড়িতে তোলার সময় তার পিঠে অস্ত্র ঠেকিয়ে ধাক্কা দেয়া হয় এবং ভেতরে ঢোকানোর পরপরই চোখ বেঁধে, জম টুপি পরিয়ে হাতে হ্যান্ডকাফ লাগানো হয়। ওই সময় তাকে হুমকি দেয়া হয় যে, সত্য না বললে ‘ক্রসফায়ার’ করে লাশ গুম করা হবে।

অপহরণের ২০-৩০ মিনিট পর তাকে একটি গেট খোলার শব্দ শুনিয়ে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার ব্লাড প্রেশার মাপা হয় এবং পরনের কাপড় খুলে একটি পুরনো লুঙ্গি ও টি-শার্ট দেয়া হয়। তাকে ৮-১০ ফিটের একটি প্লাস্টারহীন, এবড়খেবড় ওয়ালের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দী করা হয়। কটিতে একটি তেল চিটচিটে বালিশ ও পুরনো ময়লা চাদর বিছানো ছোট চৌকি ছিল এবং ২৪ ঘণ্টা একটি লাইট ও বিকট শব্দে ইন্ডাস্ট্রিয়াল একজস্ট ফ্যান চলত। লোহার শিকের দরজার বাইরে আবার কাঠের দরজাও ছিল। ইকবাল চৌধুরী জবানবন্দীতে এই অভিজ্ঞতাকে ‘জীবন্ত কবর’ হিসেবে বর্ণনা করেন। ৫ মার্চ দেয়া অতিরিক্ত জবানবন্দীতে তিনি জানান, বন্দী অবস্থায় ফজরের আজান ও ‘আসসালাতু খাইরুম মিনান নাওম’ শুনে তিনি সময় ও নামাজের ওয়াক্ত বুঝতেন।

জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাকে একটি ঠাণ্ডা এসি রুমে নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে তার আত্মীয়তার সম্পর্ক এবং কেন তিনি আওয়ামী লীগ ও ভারতের বিরুদ্ধে ফেসবুকে লিখতেন তা নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতো। ইকবাল চৌধুরী বলেন, ‘আমি কোনো দল করি না, সরকারের সমালোচনা করি।’ নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে তিনি জানান, দ্বিতীয় দিনের জিজ্ঞাসাবাদে অন্য একজন কর্মকর্তা তাকে ‘তুই-তোকারি’ করে সম্বোধন করে বলেন, ‘তুই তো মুক্তিযোদ্ধা, কোন সেক্টরে যুদ্ধ করেছিস?’ তিনি সেক্টর-২-এর কথা বললে ওই কর্মকর্তা প্তি হয়ে বলেন, ‘তুই ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়ে এসে যুদ্ধ করে আবার ভারতের বিরুদ্ধেই কথা বলিস’। এই কথা বলেই মোটা লাঠি দিয়ে তার দুই পায়ের হাঁটু, হাঁটুর নিচে ও গোড়ালিতে অমানুষিক মারধর করা হয়, যা পরে ফুলে লাল হয়ে যায়।

তৃতীয়বার জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার বাম হাতের অনামিকা আঙুলে এবং ডান কানে প্লায়ার্স কিপ লাগিয়ে ইলেকট্রিক শক দেয়া হয়। এতে তার নখ আংশিক নষ্ট হয়ে যায় এবং বাম হাতের বোধশক্তি কমে যায়। ইকবাল চৌধুরী দাবি করেন, জিজ্ঞাসাবাদের সময় সেখানে উপস্থিত একজনকে হিন্দিতে কথা বলতে শোনেন, যে বলছিল ‘ইয়ে খতরনাক আদমি হায়, বহুত টেলেন্ট অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্ট হায়’। এতে তিনি নিশ্চিত হন যে সেখানে ভারতীয় কোনো ব্যক্তির উপস্থিতি ছিল।

রমজান মাসে তাকে ১৫-১৬ ফিট উঁচু অন্য একটি রুমে নেয়া হয়, যেখানে দেওয়ালে রক্ত সদৃশ লাল রঙের দাগ এবং ইটের টুকরা দিয়ে অন্যান্য বন্দীদের আকুতিমূলক কথা ও রূপগঞ্জ থেকে আসা জনৈক বন্দীর একটি বাংলালিংক মোবাইল নম্বর লেখা ছিল। দীর্ঘ বন্দিজীবনে ট্রেন, হেলিকপ্টার ও বিমানের শব্দ এবং ১৬ ডিসেম্বর (পোলাও, গরুর গোশত, দই-মিষ্টি) ও ১৪ এপ্রিল (কাতলা মাছ ভুনা, আমের ডাল) বিশেষ খাবারের মাধ্যমে তিনি সময়ের হিসাব রাখতেন। পূর্ব কাফরুল এলাকার মৃত্যুর মাইকিং শুনে তিনি নিশ্চিত হন যে তিনি ডিজিএফআই সদর দফতরের ভেতরে ‘জেআইসি’ বা আয়নাঘরে আছেন। সেখানে তিনি আরেক বন্দী লে. কর্নেল হাসিনুর রহমানকেও দেখতে পান।

দীর্ঘ ১১ মাস পর, ২০১৯ সালের ২৫ এপ্রিল তাকে মুক্তি দেয়া হয়। মুক্তির আগে হুমকি দেয়া হয় যে, বাইরে গিয়ে এই ঘটনার কথা কাউকে বললে তাকে আবার এনে ‘হাপিস’ করে দেয়া হবে এবং তাকে একটি কাল্পনিক গল্প বলে তা বাইরে বলতে নির্দেশ দেয়া হয়। ওইদিন রাত ১২টার দিকে তাকে মোহাম্মদপুর শিয়া মসজিদের কাছে চোখ বেঁধে ফেলে যাওয়া হয়। দীর্ঘ ১১ মাস পর বাসায় ফিরে তিনি জানতে পারেন, তিনি গুম থাকা অবস্থায় তার বড় দুই বোন এবং ছোট ভাই মারা গেছেন।

জবানবন্দীর শেষে মুক্তিযোদ্ধা ইকবাল চৌধুরী এই অমানবিক নির্যাতনের জন্য তৎকালীন সরকার প্রধান শেখ হাসিনা, মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিকী, ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন ডাইরেক্টর জেনারেল এবং সংশ্লিষ্ট জেআইসি কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা তাকে এই জবানবন্দীর বিষয়ে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। এই আসামির জেরা হবে আগামি ৩০ মার্চ।

এ মামলায় ১৩ আসামির মধ্যে বর্তমানে গ্রেফতার রয়েছেন তিনজন। তারা হলেন- ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো: সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী।

পলাতক ১০ আসামির মধ্যে পাঁচজনই বিভিন্ন সময়ে ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তারা হলেন- লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) মোহাম্মদ আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল (অব:) সাইফুল আবেদিন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) মো: সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী ও মেজর জেনারেল (অব:) হামিদুল হক।

এ ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন- শেখ হাসিনার প্রতিরাবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব:) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব:) মোহাম্মদ তৌহিদুল উল ইসলাম, মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব:) মখছুরুল হক।

গুমের এ মামলায় গত বছরের ৮ অক্টোবর ১৩ জনের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের দেয়া অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। পরে ১৮ ডিসেম্বর অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে মামলার বিচার শুরুর আদেশ দেয়া হয়।