কয়েক বছর আগেও কার্যকর অনেক অ্যান্টিবায়োটিক এখন কাজ করে না

Printed Edition
back-4
বিএমইউতে অ্যান্টি মাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স রিপোর্ট প্রকাশ অনুষ্ঠানে ভিসি ডা: মো: শাহিনুল আলমসহ অতিথিরা : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

জনপ্রিয় ও কয়েক বছর আগেও কার্যকর ছিল এমন অনেক অ্যান্টিবায়োটিক এখন কাজ করে না, অকার্যকর হয়ে গেছে। ফলে ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও পরজীবীর মতো অণুজীবের বিরুদ্ধে কাজ করে এমন ওষুধ খুবই কম আছে চিকিৎসকদের হাতে। এই ওষুধগুলো প্রয়োগ করা হলে ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, অণুজীব আর মারা যায় না বা তাদের বৃদ্ধি ব্যাহত হয় না, ফলে সংক্রমণ নিরাময় করা কঠিন হয়ে পড়ে, যা বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি মারাত্মক হুমকি এবং চিকিৎসা পদ্ধতিকে ব্যাহত করছে। এটি মূলত ওষুধের ভুল ব্যবহার বা অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে ঘটে, যার কারণে অণুজীবগুলো নিজেদের পরিবর্তন করে ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে ওঠে এবং সাধারণ সংক্রমণও প্রাণঘাতী হতে পারে।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) মাইক্রোবায়োলজি ও ইমিউনোলজি বিভাগ গত এক বছরে ৪৬ হাজার ২৭৯টি নমুনা বিশ্লেষণ করে এ বিষয়ক রিপোর্ট প্রকাশ করেছে গতকাল সোমবার। যে অ্যান্টিবায়োটিকগুলো অকার্যকর হয়ে গেছে এগুলোর মধ্যে সিপ্রোফ্লোক্সাসিন অ্যামোক্সিসিলিন, সেপট্রিয়াক্সজন জেনটামাইসিন, মেরোপেনাম, টিগেসাইসিলি অন্যতম। চিকিৎকদের ভাষায় এ ওষুধগুলো রেজিস্ট্যান্ট হয়ে গেছে।

রেজিস্ট্যান্ট হওয়ার কারণে সুস্থ হতে অনেক দেরি হচ্ছে। রোগী সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে রোগীর মৃত্যু হচ্ছে।

গতকাল বিএমইউর মিল্টন হলে আয়োজিত অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স রিপোর্ট ২০২৪-২০২৫ প্রকাশ করা হয়। এতে বিএমইউর ভিসি অধ্যাপক ডা: মো: শাহিনুল আলম প্রধান অতিথি ছিলেন। ভিডিও বার্তা প্রদান করেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা: মো: সায়েদুর রহমান। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন প্রোভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা: মো: আবুল কালাম আজাদ, ডিন অধ্যাপক ডা: মো: ইব্রাহীম সিদ্দিক, ডিন অধ্যাপক ডা: মো: আতিয়ার রহমান, ডিন ডা: সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্ত, নবজাতক বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা: মো: আব্দুল মান্নান, শিশু হেমাটোলজি অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা: মো: আনোয়ারুল করিম, ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা: আয়েশা খাতুন, গাইনোকোলজিক্যাল অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা: জান্নাতুল ফেরদৌস, ল্যাবরেটরি মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা: মো: সাইফুল ইসলাম, বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা: নায়লা আতিক খান। সভাপতিত্ব করেন মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড ইমিউনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা: আবু নাসের ইবনে সাত্তার।

অধ্যাপক ডা: মো: শাহিনুল আলম বলেন, সমস্যার দায় ও সমাধানের দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিতে হবে। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের ক্ষেত্রে গবেষণা, গাইডলাইন প্রণয়ন, বাস্তবায়নে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বিএমইউকে নেতৃত্ব দিতে হবে। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করা অসম্ভব নয়। মনে রাখতে হবে যেগুলো সমাধান যোগ্য নয় তারও উপায় খুঁজে বের করার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের। সেই দায়িত্ব পালন করে জাতিকে আশার আলো দেখাতে হবে।

গত এক বছরে মোট ৪৬ হাজার ২৭৯টি নমুনার মধ্যে ১১ হাজার ১০৮টি (২৪ শতাংশ) কালচার পজিটিভ হয়। এই রিপোর্টে জীবাণুগুলোকে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতি রেজিস্ট্যান্ট পাওয়া যায় অর্থাৎ এসব জীবাণুর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে সেগুলো কাজ করে না। রেজিস্ট্যান্ট পাওয়া যায় প্রশ্রাবের সর্বোচ্চ জীবাণুকে, এরপরই রক্তের জীবাণ্।ু প্রস্রাবে প্রধান জীবাণু ছিল ই-কোলি ও রক্তে স্যালমোনেলা টাইফি সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। রক্তে স্যালমোনেলা টাইফিতে সিপ্রোফ্লোক্সাসিন রেজিস্ট্যান্স সর্বোচ্চ সংখ্যক পাওয়া যায়। তবে ক্লোরামফেনিকো এবং ট্রাইমেথোপ্রিম-সালফামেথাক্রোজলের বিরুদ্ধে রেজিস্ট্যান্স তুলনামূলক কম। কয়েকটি আইসোলেট সেফট্রিয়াক্সনের প্রতিও রেজিস্ট্যান্স পাওয়া যায় কিন্তু এটার জন্য জেনেটিক সিকোয়েন্সিংয়ের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে। ই-কোলি সিপ্রোফ্লোক্সাসিন ও অ্যামোক্সিসিলিনের প্রতি রেজিস্ট্যান্স উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে যদিও মেরোপেনাম ও টিগাসাইক্লিন এখনো কার্যকর।

নিউমোনিয়া ও মূত্রনালীর সংক্রমণজনিত ব্যাক্টেরিয়া ক্লেবসিয়েলাতে সেপট্রিয়াক্সজন, জেনটাসমাইসিন ও সিপ্রোফ্লোক্সাসিলিনের রেজিস্ট্যান্স মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রায়। তবে এ ক্ষেত্রে কলিস্টিন ও টিগাসাইক্লিন এখনো কার্যকর হলেও রেজিস্ট্যান্সের প্রবণতা বাড়ছে। এসিনেটোবেক্টার এসপিপিতে প্রায় সব প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে উচ্চমাত্রার রেজিস্ট্যান্স পাওয়া গেছে, এমনকি মেরোপেনেম ও টিগাসাইসিলিনেও রেজিস্ট্যান্সের ঊর্ধ্বগতি লক্ষ করা যাচ্ছে, বিশেষত হাসপাতাল অর্জিত সংক্রমণে।

অনুষ্ঠানে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের ওপর তৈরি পোস্টার প্রেজেনটেশন ইভেন্টে বিজয়ী চিকিৎসকদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।