জিয়াউল আহসানকে ‘পিএনজি’ ঘোষণা করা হয়েছিল : সাবেক সেনাপ্রধান
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
- মানবতাবিরোধী অপরাধ
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে শতাধিক মানুষকে গুম ও খুনের ঘটনায় সাবেক সেনাকর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব:) ইকবাল করিম ভূঁইয়ার জেরা সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার পঞ্চম দিনের জেরায় আসামিপক্ষের আইনজীবী আবুল হাসানের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রদান করেন।
জবানবন্দীতে ইকবাল করিম ভূঁইয়া দাবি করেন, র্যাবে কর্মরত থাকাকালীন তৎকালীন লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান সেনাসদরের আদেশ অমান্য করে দু’জন অফিসারকে ফেরত না পাঠানোয় তাকে সেনাবাহিনীতে ‘পার্সোনা নন গ্রাটা’ (অবাঞ্ছিত ব্যক্তি) ঘোষণা করা হয়েছিল। এ ছাড়া র্যাবের ‘কিলিং মিশন’ এবং কেনাকাটায় দুর্নীতির বিষয়ে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের প্রভাব ও সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও তার বক্তব্যে উঠে আসে।
এক প্রশ্নের জবাবে সাবেক এই সেনাপ্রধান বলেন, ২০০৭-২০০৯ এর মধ্যে প্রথম দিকে কয়েক মাস আমি চিফ অব জেনারেল স্টাফ ছিলাম। ওই সময় কিছু অফিসারের অপকর্মের রিপোর্ট আমার কাছে আসে। আমি জেনারেল মইন ইউ আহম্মেদকে মৌখিকভাবে জানালে তিনি আমাকে এসব বিষয় থেকে দূরে থাকতে পরামর্শ দেন। পরবর্তীতে জেনারেল মইন আমাকে ওই পদ থেকে সরিয়ে স্টাফ কলেজে পোস্টিং দেন। অপকর্মের সাথে জড়িতদের মধ্যে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমিন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বারী, লে. কর্নেল সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার, ৪৬ পদাতিক ব্রিগেডের কিছু অফিসার যাদের নাম মনে নেই, লে. কর্নেল মেহেদীর নাম এই মুহূর্তে মনে আছে। আমার পরে মেজর জেনারেল সিনা ইবনে জামালী চিফ অব জেনারেল স্টাফ হন। চিফ অব জেনারেল স্টাফের কাজগুলোর মধ্যে সামরিক অভিযান, সামরিক গোয়েন্দা কার্যক্রম, সামরিক প্রশিক্ষণ, ইউএন মিশন ইত্যাদি অন্যতম। ইহা সত্য নহে যে, আমি জেনারেল মইনকে মৌখিকভাবে কিছু অফিসারকে অপকর্মের বিষয়ে জানাইনি।
জবানবন্দীতে ২০০৯ সালের বিডিআর হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট টেনে তিনি বলেন, ‘বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর প্রায় সব সিনিয়র অফিসার ভারত ও আওয়ামী লীগ বিদ্বেষী হয়ে উঠেছিলেন। জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে সিনিয়রদের প্রতি বিদ্বেষ ও ঘৃণা তৈরি হয়েছিল।’ তিনি আরো জানান, প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের দরবারে জোরালো বক্তব্য রাখায় ৬-৭ জন জুনিয়র অফিসারকে তখন ফোর্সড রিটায়ারমেন্টে পাঠানো হয়েছিল।
তিনি বলেন, জবানবন্দীতে যে চারটি চক্রের কথা বলেছি তা ২০০৯ সাল থেকে ২০১৫ সালে আমার অবসর গ্রহণ পর্যন্ত চলমান ছিল। পরবর্তীতে কী হয়েছে আমার জানা নেই। ২০০৯-২০১৫ সালের মধ্যে হাসান মাহমুদ এবং বেনজীর র্যাবের প্রধান ছিলেন। অন্যদের নাম মনে নেই। তখন ডিজিএফআই প্রধান ছিলেন মেজর জেনারেল মোল্লা ফজলে আকবর, মেজর জেনারেল মামুন খালেদ এবং মেজর জেনারেল আকবর। এনএসআই প্রধান ছিলেন মেজর জেনারেল মঞ্জুর (অব:)। তিনি মেজর জেনারেল তারেক আহম্মেদ সিদ্দীকের ব্যাচমেট ছিলেন। তখন এনটিএমসি ছিল না। এসব অফিসারের মধ্যে কেউ সেনাবাহিনীতে ফেরত আসেননি। তখন প্রধানমন্ত্রীর মিলিটারি সেক্রেটারি (এমএসপিএম) ছিলেন মেজর জেনারেল মিয়া জয়নুল আবেদিন।
র্যাবের কর্মকাণ্ড নিয়ে সাবেক এই সেনাপ্রধান বলেন, ‘আমি সেনাপ্রধান হওয়ার পর লে. কর্নেল মুজিবকে মৌখিক আদেশের মাধ্যমে ক্রসফায়ার বন্ধ করতে বলেছিলাম। জিয়াউল আহসানকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্যও তাকে আদেশ দিয়েছিলাম।’ তিনি আরো দাবি করেন, দু’জন অফিসারকে যখন ‘কিলিং মিশনে’ যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, তারা সেই আদেশ অমান্য করে ঢাকা সেনানিবাসের এমপি চেকপোস্টে রিপোর্ট করেছিলেন। তবে এটি তার এখতিয়ারভুক্ত না হওয়ায় তিনি কোনো তদন্ত করতে পারেননি।
জেরার একপর্যায়ে কেনাকাটায় দুর্নীতির প্রশ্ন উঠলে তিনি তা স্বীকার করেন। ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘আমি সেনাপ্রধান থাকাকালীন কেনাকাটা সংক্রান্ত দুর্নীতি হয়েছিল। তবে তা আমার এখতিয়ারের বাইরে ছিল বিধায় আমি তদন্ত করিনি।’ তিনি উল্লেখ করেন, এএফডি (আর্মড ফোর্সেস ডিভিশন) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন হওয়ায় এবং ডিজি ডিপি-র কার্যক্রম সরাসরি তার অধীনে না থাকায় তিনি এসব বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারেননি।
গতকাল জেরা শেষে আদালত আগামী ৯ মার্চ পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেছেন। মামলার একমাত্র আসামি সাবেক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান বর্তমানে করাগারে রয়েছেন এবং গতকাল শুনানির সময় তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছিল।