আফগান সীমান্তে পাকিস্তানের হামলা
২৯ টিটিপি সদস্য ও ৩৬ বেসামরিক নিহতের দাবি
Printed Edition
জিও নিউজ
পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে পাকিস্তানি সেনা ও পুলিশের যৌথবাহিনীর এক বিশেষ অভিযানে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। পাকিস্তানের দাবি অনুযায়ী, অভিযানে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি গোষ্ঠী তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) ২৯ জন সদস্য নিহত হয়েছেন। অন্য দিকে, আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের দাবি, এই হামলায় নারী ও শিশুসহ ৩৬ জন বেসামরিক আফগান নাগরিক নিহত এবং আরো ১৬৩ জন আহত হয়েছেন। গত রোববার রাতে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এই যৌথ স্থল ও বিমান অভিযান চালানো হয়। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেয়া এক বার্তায় এই অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
করাচি হামলার জেরে পাল্টা পদক্ষেপ
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী জানান, সম্প্রতি দেশটির খাইবার পাখতুনখোয়া, বেলুচিস্তান ও সিন্ধ প্রদেশে আফগান সন্ত্রাসীদের ধারাবাহিক হামলার জবাব দিতেই এই ত্বরিত পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বিশেষ করে, গত শনিবার রাতে সিন্ধ প্রদেশের রাজধানী করাচির গুলিস্তান-ই-জওহর এলাকায় আধাসামরিক বাহিনী রেঞ্জার্সের আঞ্চলিক সদর দফতরে এক ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় তিন কর্মকর্তা নিহত হন। বন্দুক ও বিস্ফোরক সজ্জিত যোদ্ধাদের এই হামলার দায় স্বীকার করেছে পাকিস্তানি তালেবানের একটি বিচ্ছিন্ন অংশ ‘জামাত-উল-আহরার’। ঘটনার সময় নিরাপত্তা বাহিনী তিন হামলাকারীকে হত্যা করে এবং আহত অবস্থায় এক আফগান নাগরিককে গ্রেফতার করে। এই ঘটনার রেশ ধরেই রোববার রাতে আফগান সীমান্তে পাল্টা অভিযান পরিচালনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী।
পাকিস্তানের দাবি বনাম আফগানিস্তানের অভিযোগ
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার জানিয়েছেন, অভিযানে পাকিস্তানি তালেবানের (টিটিপি) গোপন আস্তানা ও নিরাপদ আশ্রয়স্থলগুলোকে সফলভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। আড়াই দশক আগে আফগান তালেবানের আদর্শে গঠিত এই টিটিপি-কে পাকিস্তান সরকার অনেক আগেই নিষিদ্ধ করেছে এবং বর্তমানে সরকারিভাবে এদের ‘ফিতনা আল খারিজি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। তিনি এক্সে বলেন ‘দেশজুড়ে একাধিক হামলার জবাবে এই অভিযান চালানো হয়েছে এবং নিহতরা সবাই নিষিদ্ধ টিটিপির সদস্য।’
এ দিকে আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের উপ-মুখপাত্র হামদুল্লাহ ফিতরাত পাকিস্তানের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে এক্সে পোস্ট করেছেন। তার মতে, পাকিস্তানের এই আন্তঃসীমান্ত হামলায় আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় তিনটি প্রদেশে ৩৬ জন বেসামরিক নাগরিক ‘শহীদ’ হয়েছেন এবং ১৬৩ জন আহত হয়েছেন।
দীর্ঘমেয়াদি সঙ্ঘাত ও কূটনৈতিক টানাপড়েন
আফগান তালেবান এবং পাকিস্তানি তালেবান (টিটিপি) পৃথক গোষ্ঠী হলেও তারা পরস্পরের মিত্র। পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগানিস্তানের বর্তমান তালেবান সরকার টিটিপি জঙ্গিদের আশ্রয় দিচ্ছে, যা কাবুল সবসময়ই অস্বীকার করে আসছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে পাকিস্তানের বিমান হামলা এবং আফগানিস্তানের পাল্টা হামলার পর থেকে সীমান্ত-পার লড়াইয়ে ইতোমধ্যে শত শত মানুষ নিহত হয়েছে। গত এপ্রিলে চীনের মধ্যস্থতায় বেইজিংয়ে দুই দেশের মধ্যে শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে উভয় পক্ষ সঙ্ঘাত না বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু মাত্র তিন সপ্তাহের ব্যবধানে পাকিস্তানের এই সর্বশেষ বড় ধরনের সামরিক অভিযান এবং বিমান হামলা সেই আপেক্ষিক শান্ত পরিস্থিতির অবসান ঘটাল। বিশ্লেষকদের মতে, রোববারের এই রক্তক্ষয়ী অভিযানের ফলে ইসলামাবাদ ও কাবুলের মধ্যে আগে থেকেই বিদ্যমান উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক আরো মারাত্মক রূপ নিতে পারে।