অধিকারের আলোচনা সভা

২৫ বছরে দেশে নির্যাতনের পর ৪৮৬ জনের মৃত্যু হয়েছে

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

২০০১ থেকে ২০২৬ সালের ২২ জুন পর্যন্ত প্রায় ২৫ বছরে দেশে নির্যাতনের পর ৪৮৬টি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। যার মধ্যে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারের আমলে ঘটেছে ১৮৪টি মৃত্যুর ঘটনা। ২০০৬ এর ২৯ অক্টোবর থেকে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ছয়টি, পরবর্তীতে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় (২০০৭-২০০৯) ৪২টি ঘটনা।

২০০৯ জুন থেকে ২০২৪ এর জুন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঘটেছে ২১৩টি মৃত্যুর ঘটনা। এ ছাড়া ২০২৪ এর জুলাই অভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, নিরাপত্তা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগের হাতে প্রায় ১৪০০ জন নিহত হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার ‘নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের সমর্থনে আন্তর্জাতিক দিবস’ উপলক্ষে জাতীয় প্রেস ক্লাবে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

সংগঠনের পরিচালক (প্রশিক্ষণ ও অ্যাডভোকেসি) তাসকিন ফাহমিনার সঞ্চলনায় বক্তব্য রাখেন, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সেক্রেটারি শফিকুল আলম, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাব্যুনালের প্রসিকিউটর ও বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা তানভীর হাসান জোহা, মানবাধিকার কর্মকর্তা জাহিদ হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যধাপক মো: শরীফুল ইসলাম, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ফজুল হাকিম, ডেউলি স্টারের সিনিয়র সাংবাদিক জাইমা ইসলাম। এ ছাড়াও গুম ও খুনের শিকারের পরিবারের সদস্যরা বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানের মূল বক্তব্য তুলে ধরেন সাজ্জাদ হোসেন।

শিশির মনির বলেন, যে সংস্কার বা পরিবর্তনের জন্য জুলাই গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল সেই পরিবর্তন প্রয়োজন। তা না হলে কোনো সেক্টরেই মানুষ সুফল পাবে না। তিনি বলেন, একটি দেওয়ানি মামলা টানা ৬৭ বছর ধরে চলছে। যে ব্যক্তি মামলা শুরু করেছিলেন তিনি মারা গেছেন, তার সন্তানও মারা গেছেন। এখন নাতিকে হাইকোর্টের বারান্দায় ঘুরতে হচ্ছে। জীবনের চেয়েও লম্বা এই বিচারিক প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে তিনি দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে সিস্টেমেটিক পরিবর্তনের দাবি জানান। তিনি বলেন, ১০ বছর পরে বিচার পাওয়ার কোনো ফায়দা নেই। বিচার পাওয়া বা না পাওয়ার সিদ্ধান্ত দ্রুত হওয়া জরুরি।

তিনি বলেন, দেশের বিচারব্যবস্থার ভয়াবহ অব্যবস্থাপনার চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে, একজনের বিরুদ্ধে ৬১টি ‘ভুতুড়ে মামলা’ দেয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। যেখানে বাদি ও আসামি কেউই একে অপরকে চেনে না। প্রশাসনকে ‘টিস্যু পেপারের’ মতো ব্যবহারের সমালোচনা করে বক্তা জানান, হাইকোর্টে বর্তমানে ১২৩৬টি মৃত্যুদণ্ডের মামলা ঝুলে আছে, যা বর্তমান গতিতে নিষ্পত্তি করতে অন্তত ১০ বছর সময় লাগবে। বিচার ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে তিনি ম্যাজিস্ট্রেটের গোপন কক্ষের বদলে ওপেন কোর্টে কনফেশনাল স্টেটমেন্ট রেকর্ড করার প্রস্তাব দেন। তিনি আরো বলেন, মানুষ এখন পুলিশের কাছে যেতে ভয় পায় যার কারণে বিচার পেতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করে যা একটি অকার্যকর সিস্টেমের লক্ষণ। বিচার বিভাগকে দুর্নীতিমুক্ত ও অনলাইন মেকানিজমের আওতায় এনে গণমুখী করার দাবি জানান তিনি।

শফিকুল আলম বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই দেশে নির্যাতনের একটি অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের দমনে এই টর্চারকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। অনেক ক্ষেত্রে রিমান্ডে টর্চার করে মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায়ের মাধ্যমে ফাঁসি দেয়ার মতো ঘটনাও ঘটে। এতে করে কারো ফাঁসি হলে প্রশ্ন জাগে ওই ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষেই অপরাধী নাকি তাকে জোর করে স্বীকার করানো হয়েছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে তিনি পৃথক ইনভেস্টিগেটিং সার্ভিস, নতুন প্রসিকিউটোরিয়াল সার্ভিস এবং একটি স্বাধীন ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস কমিশন গঠনের ওপর জোর দেন।

তানভীর হাসান জোহা বলেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের যারা গুম খুনের সাথে জড়িত, তাদের প্রত্যেককে খুঁজে বের করবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। শুধু ট্রাইব্যুনালকে একটু সময় দিতে হবে। কারণ গুম খুনের সাথে জড়িতরা নিজেদের তৈরি ডিটিজাল জালে আটকে পড়েছে। যারা গুম হয়েছে তাদের প্রত্যেককে ডিজিটালি ট্রিগার করেছে। যার প্রত্যেকটি ডাটা আমাদের আর্কাইভ করা আছে। তিনি বলেন, তিনি নিজেও ২০১৬ সালে গুমের শিকার হয়েছিলেন। তিনি ভিক্টিমদের জবানবন্দী শোনা, প্রমাণ সংরক্ষণ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বক্তারা বলেন, শক্তিশালী এবং সার্বিক মানবাধিকার কমিশন আইন তৈরি করতে হবে। যা করে সেই কমিশন সরকারের প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে পারে এবং নির্যাতনসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুষ্ঠু তদন্ত করতে পারে।