শীতের ফুল গাঁদা : হাসান মাহমুদ রিপন

Printed Edition
pas-1
শীতের ফুল গাঁদা : হাসান মাহমুদ রিপন

ফুল সৌন্দর্যের প্রতীক। মানুষ ফুলকে ভালোবাসে। শীতের অন্যতম জনপ্রিয় ফুল গাঁদা। শীতকালেই গাঁদা ফুলটি দেখতেও দারুণ এবং বেশি দেখা যায়। গাঁদা ‘কম্পোজিটি’ পরিবারভুক্ত ‘ট্যাজিটিজ’গণের একটি অতি সুন্দর ফুল। একে অনেকে ‘গেন্ডা’ ফুলও বলে থাকে। এর ইংরেজি নাম ‘মেরিগোল্ড’। গাঁদা ফুলের বিভিন্ন প্রজাতি যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা রাজ্য এবং আমেরিকার মেক্সিকো, আর্জেন্টিনায় উৎপত্তি হয়েছে। আমাদের দেশে শহর বন্দর ও গ্রামাঞ্চলে অতি প্রাচীন থেকেই এ ফুল ছড়িয়ে আছে। গাঁদা এত জনপ্রিয়তা কেন তা বিশ্লেষণ করে জানা যায়, এ ফুলের চাষপদ্ধতি অপেক্ষাকৃত সহজ, খরচের তুলনায় অধিক লাভজনক, দীর্ঘকালীন সজীবতা, বাগানের শোভাবর্ধন, রঙ, বর্ণবৈচিত্র্য ও কোমলতা সর্বশ্রেণীর মানুষের কাছে মনোমুগ্ধকর ও তৃপ্তিকর। তা ছাড়া এ ফুল শুধু বাগানের সৌন্দর্য বর্ধনেই শীর্ষস্থানীয় নয় বরং উৎসব-অনুষ্ঠানে, গৃহসজ্জায়, শ্রদ্ধা জানাতে, হিন্দুদের পূজা পার্বণে, বিভিন্ন জাতীয় দিবসে ফুলের তোড়া ও মালা বানাতে এ ফুলটি বহুল পরিমাণে ব্যবহৃত হয়ে আসছে বলেই গাঁদার জনপ্রিয়তা এত সর্বজনবিদিত।

গাঁদা ফুলের প্রজাতি রয়েছে প্রায় ২০টি। কিন্তু সব প্রজাতি গুরুত্বপূর্ণ নয়। উদ্যানে ব্যবহার, জনপ্রিয়তা, চাষ ও চাহিদা অনুযায়ী আমাদের দেশে দু’প্রজাতির গাঁদা চাষাবাদ হয়ে থাকে। যেমন একটি হলো আফ্রিকান গাঁদা এবং অপরটি ফরাসি গাঁদা। আফ্রিকান তিউনিশিয়া থেকে এ প্রজাতির গাঁদা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছে বিধায় একে আফ্রিকান গাঁদা বলে অভিহিত করে। এ প্রজাতির ফুলগুলো বেশ বড় হয় এবং ফুলধারী গাছ অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এ প্রজাতির গাঁদা হলুদ, বাসন্তী, কমলা, সোনালি, সাদা বর্ণের এক রঙা ফুল হয়ে থাকে। এসব গাঁদা জমিতে এবং টবে চাষ করা হয়। আফ্রিকান প্রজাতির গাঁদার রয়েছে অনেক অনেক নাম। এগুলোর মধ্যে অন্যতম বিউটি অরেঞ্জ, ফাস্ট হোয়াইট, বিউটি গোল্ড, ক্রেকারজেক, ক্লাইমেক্স গোল্ড, ডায়মন্ড জুবিলী, ইয়োলো সুপ্রিম, ট্রেসবিয়েন অরেঞ্জ, এপোলো, ভাইকিং, ফার্স্টলেডি, কিউপিউ, মি. মুনলাইট, গোল্ডেন এইজ, স্পান গোল্ড ইত্যাদি।

অপর দিকে অন্য প্রজাতি হলো ফরাসি। এ প্রজাতির প্রথমে ফ্রান্সে চাষ হয় বলে এটি ফরাসি নামে অভিহিত করা হয়। এ প্রজাতি ফুলটি এক বর্ষজীবী। এ গাঁদাটির পাতা গাঢ় সবুজ বর্ণের এবং ফুল আফ্রিকান গাঁদার চেয়ে আকারে ছোট। কিন্তু সংখ্যা অনেক বেশি হয় এবং আগাম ফুল ফুটে। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে এ ফুল ফোটা অব্যাহত থাকে। এ গাঁদা ফিকে লাল থেকে গাঢ় লাল পর্যন্ত নানা রঙের হয়ে থাকে। এ ছাড়া হলুদ বা দু’রঙা ফুলও দেখা যায়। যেমন হলুদে ফুলের ফোটার ওপর ছিটে-ফোঁটায় ছোপ ছোপ ভাবে লাল রঙ মেশানো থাকে। ফরাসি জাতের গাঁদায়ও বেশকিছু নাম রয়েছে। তা হলো বোনাজা ফ্লেইম, হারমুনি, অরেঞ্জ বয়, স্প্রে বয়, কারমেন, ফ্রিয়েস্টা, হানিকম, গোন্ডি, ডুপ্লেক্স গোল্ড, রেডচেরি, গোল্ডেন জেম, জিপসি ডেনসার, পাসকেল, স্টারডাস্ট ইত্যাদি।

গাঁদা সব ধরনের মাটিতে চাষ করা হয়। তবে উর্বর হওয়া মাটিতে একটু ভালো জন্মে। শীতের আমেজ না পেলে গাঁদার পুষ্পমঞ্জুরি বিকশিত হয় না। সূর্যের আলো পড়ে, হাওয়া বয় এই রকম উন্মুক্ত স্থানে গাঁদা ফুলের চাষ করতে হয়। গাঁদা কেবল ফুল হিসেবেই নয়, অন্য ক্ষেত্রেও এর যথেষ্ট গুণাবলী রয়েছে এবং আরো রয়েছে ভেষজ সমৃদ্ধ গুণাবলী। শরীরের ক্ষত ও আঘাতে গাঁদা গাছের রস প্রয়োগ করলে ক্ষতস্থান শিগগিরই আরোগ্য লাভ করে। এ ছাড়া হাঁস-মুরগিকে এই ফুল খাওয়ালে এদের ডিমে হলুদ অংশের উৎকর্ষতা বৃদ্ধি পায় অনেক। আমাদের দেশে ফরাসি গাঁদার চেয়ে আফ্রিকান গাঁদার চাষ হয় বেশি। তা ছাড়া জনপ্রিয়তা এবং ফলনও সবচেয়ে বেশি। আজকাল গাঁদা ফুলের বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষাবাদ হচ্ছে। অনেকে তাদের জমিতে অন্য ফসলাদি চাষাবাদ না করে এ শীতে গাঁদা চাষে ব্যাপক লাভবান হচ্ছে।