লোভনীয় পদে নিয়োগ পেতে মির্জা আজমের ডিও নিয়েছিলেন আতাহার
Printed Edition
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের অনিয়ম ও দুর্নীতির একটি প্রতিবেদন সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এটি প্রকাশের পরপরই প্রতিবেদককে গ্রেফতার করে পুলিশ। প্রতিবেদনের তথ্য নিয়ে আপত্তি থাকলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা না নিয়ে সরাসরি গ্রেফতারের বিষয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় সামনে আসছে প্রতিবেদনে থাকা সংস্থাটির পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো: শহীদ আতাহার হোসেনের নাম। এই কর্মকর্তা শেখ হাসিনার আমলে একই পদে পদায়ন হতে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের একজন নিবেদিত কর্মকর্তা হয়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজমের সুপারিশ নিয়েছিলেন।
২০২২ সালের ১২ এপ্রিল জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনকে পাঠানো একটি আধাসরকারি পত্রে এই সুপারিশ করেছিলেন। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ওই সময়ের পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি মির্জা আজম সুপারিশে তাকে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের একজন নিবেদিত কর্মকর্তা উল্লেখ করে বলেছিলেন, আমার নিজ জেলার বাসিন্দা মো: শহীদ আতাহার হোসেন (৮০৪২) উপসচিব হিসেবে সুরক্ষা সেবা বিভাগের অধীন ফায়ার সার্ভিসের ১১ মডার্ন প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে কর্মরত। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) পদটি বর্তমানে শূন্য হওয়ায় ফায়ার সার্ভিসে কর্মরত থাকায় অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মো: শহীদ আতাহার হোসেনকে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) পদে পদায়নের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জোর সুপারিশ করছি। উল্লেখ, তিনি মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের একজন নিবেদিত কর্মকর্তা।
জানা গেছে, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের প্রশাসনিক অনিয়ম, কেনাকাটায় দুর্নীতির অভিযোগ এবং কিছু কর্মকর্তার কর্মকাণ্ড নিয়ে তথ্য-উপাত্তভিত্তিক একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাফিজুর রহমান শফিকের বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা দায়ের করা হয়। পরে শাহবাগ থানা পুলিশ তাকে গ্রেফতার দেখায়।
অভিযোগ রয়েছে, সংবাদ প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট অধিদফতরের একটি প্রভাবশালী মহল দ্রুত আইনি পদক্ষেপ গ্রহণে সক্রিয় হয়ে ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, শাহবাগ থানার এসআই জিয়াউলের নেতৃত্বে একটি পুলিশ দল সাংবাদিক শফিককে তার কর্মস্থল থেকে বাসার কাছাকাছি মগবাজার এলে মঙ্গলবার রাতে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। সাইবার সুরক্ষা আইনে দায়ের করা একটি মামলায় গ্রেফতার দেখানোর ঘটনায় দেশের গণমাধ্যম অঙ্গনে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
সাংবাদিক সমাজ, বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন এবং মানবাধিকারকর্মীরা এ ঘটনাকে স্বাধীন সাংবাদিকতা, বাকস্বাধীনতা ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন। তাদের দাবি, প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর যথাযথ তদন্তের পরিবর্তে দ্রুত একজন সাংবাদিককে গ্রেফতার করা স্বাধীন গণমাধ্যমের জন্য নেতিবাচক বার্তা বহন করে।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহু সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে লিখেছেন, কোনো সংবাদ প্রকাশের পর তার সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের পরিবর্তে দ্রুত মামলা ও গ্রেফতার স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য অশনিসঙ্কেত।
সিনিয়র সাংবাদিকদের অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের তথ্য নিয়ে আপত্তি থাকলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা উচিত ছিল। কিন্তু তদন্তের আগেই একজন সাংবাদিককে গ্রেফতার করা কতটা আইনসম্মত, যৌক্তিক ও ন্যায়সঙ্গত সেই প্রশ্ন এখন জনমনে দেখা দিয়েছে।
সাংবাদিক সমাজের একাংশের অভিযোগ, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেফতারের প্রবণতা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য বড় ধরনের হুমকি। তাদের মতে, এতে ভবিষ্যতে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা নিরুৎসাহিত হতে পারে।