পিলখানা ট্র্যাজেডির ১৭ বছর

শহীদ সেনাকর্মকর্তাদের প্রতি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

  • অন্তর্বর্তী সরকারের তদন্ত কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের ঘোষণা
  • কমিশনের রিপোর্ট ও দোষীদের নাম প্রকাশের আহ্বান জামায়াতের

২০০৯ সালের পিলখানা সদর দফতরে সংঘটিত বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ১৭ বছর পূর্ণ হয়েছে। বিডিআর বিদ্রোহের সেই নৃশংস ঘটনায় শহীদ ৫৭ জন সেনাকর্মকর্তাসহ ৭৪ জন শহীদের স্মরণে বুধবার যথাযথ মর্যাদায় ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’ পালিত হয়েছে। দিনটি উপলক্ষে বনানী সামরিক কবরস্থানে শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বুধবার সকালে বনানী সামরিক কবরস্থানে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধার্পণ শুরু হয়। প্রথমে রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন শহীদ সেনাকর্মকর্তাদের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর তারা মহান আল্লাহর দরবারে শহীদদের রূহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া ও মুনাজাত করেন। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তারা সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পর তিন বাহিনীর প্রধান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এবং বিজিবির মহাপরিচালক শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর শহীদ পরিবারের সদস্য এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়।

এ দিকে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের যথাযথ বিচার নিশ্চিত করা হবে যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের পুনরাবৃত্তি না ঘটে। তিনি বলেন, ‘পিলখানা হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল সেনাবাহিনীকে দুর্বল করার গভীর ষড়যন্ত্র ছিল। এই অপকর্ম তারাই করতে পারে যারা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করে না।’

মন্ত্রী জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় গঠিত ‘জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন’-এর রিপোর্ট বর্তমান সরকারের হাতে এসেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা নতুন করে কোনো তদন্ত কমিশন গঠন করব না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যথোপযুক্ত লোক দিয়েই কমিশন গঠন করেছিল। এখন আমাদের কাজ হলো সেই রিপোর্টের সুপারিশগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা এবং বিচারাধীন মামলাগুলোর বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুত সমাপ্ত করে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা।’

অন্যদিকে বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কুশীলবদের খুঁজে বের করতে একটি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান। তিনি বলেন, ‘বিগত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশের জনগণ গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর এখন বড় সুযোগ এসেছে এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের পেছনে দায়ী শক্তিগুলোকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসার।’

মির্জা ফখরুল এই দিনটিকে জাতির জন্য লজ্জার ও কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষ থেকে শহীদ পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

জামায়াত আমিরের কবর জিয়ারত : পিলখানা হত্যাকাণ্ডে শহীদ সেনাসদস্যদের কবর জিয়ারত করেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পরিকল্পিতভাবে জাতির শ্রেষ্ঠসন্তান দেশপ্রেমিক সেনাকর্মকর্তাদের হত্যা করা হয়েছিল। দেশবাসী এই নির্মম ঘটনার প্রকৃত কারণ ও নেপথ্যের কারিগরদের নাম জানতে চায়।’ তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী দোষী ব্যক্তিদের নাম অবিলম্বে জাতির সামনে প্রকাশ করার এবং তাদের দ্রুত গ্রেফতার করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান। এনসিপি আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো: নাহিদ ইসলাম পিলখানার শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে এক বিস্ফোরক দাবি তোলেন। তিনি বলেন, চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে গণহত্যা ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি এই গণহত্যার দায় এড়াতে পারেন না। আসন্ন সংসদের প্রথম অধিবেশনেই তাকে অভিশংসন করতে হবে এবং এরপর তাকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে হবে।’

দিবসটি উপলক্ষে বনানী সামরিক কবরস্থান ছাড়াও পিলখানা বিজিবি সদর দফতরসহ সব সেনানিবাসে বিশেষ মুনাজাত ও কুরআন খতমের আয়োজন করা হয়। বিকেলে সেনানিবাসের বিভিন্ন ইউনিটে ইফতার, দোয়া মাহফিল ও আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

২০০৯ সালের সেই কালো দিনে পিলখানায় যে ক্ষত তৈরি হয়েছিল, ১৭ বছর পর এসে নতুন সরকারের অধীনে সেই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিচার ও তদন্তের প্রতিশ্রুতি শহীদ পরিবারগুলোর মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জীবন উৎসর্গকারী এই বীর সেনাদের আত্মত্যাগ চিরকাল শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে জাতি।