শতাধিক ট্রেন কোচের চাকা নষ্ট

সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় যন্ত্রাংশের অভাব, সেবা বিঘেœর শঙ্কা

Printed Edition
bangla-1
রেলওয়ে কারখানায় ট্রেনের কোচ মেরামত করছেন মেকানিকরা : নয়া দিগন্ত

মো: জাকির হোসেন সৈয়দপুর (নীলফামারী)

আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে ট্রেন যাত্রায় ভোগান্তির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নীলফামারীর সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় দীর্ঘদিন ধরে শুধুমাত্র চাকার অভাবে অচল পড়ে আছে শতাধিক যাত্রীবাহী রেল কোচ (বগি)। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় ছোট ছোট যন্ত্রাংশের সঙ্কটে আরো প্রায় শতাধিক কোচ মেরামতের অপেক্ষায় পড়ে আছে। ফলে ঈদযাত্রায় প্রয়োজনীয় কোচের ঘাটতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কারখানা সূত্র জানায়, সারা বছর ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলাচলকারী আন্তঃনগর ট্রেনের একাধিক কোচে ত্রুটি দেখা দিলে সেগুলো মেরামতের জন্য সৈয়দপুরে পাঠানো হয়। বর্তমানে প্রায় দুই শতাধিক কোচ কারখানায় পড়ে আছে। এর মধ্যে ১০০টিরও বেশি কোচ কেবল চাকা পরিবর্তন করলেই সচল করা সম্ভব। কিন্তু কয়েক মাস ধরে নতুন চাকার সরবরাহ না থাকায় সেগুলো মেরামত থমকে আছে। একই সাথে ¯িপ্রং, বিয়ারিং, পিক আয়রন, হার্ডক্লকসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশের অভাবে আরো প্রায় ১০০টি কোচ অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সামান্য ত্রুটি থাকলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ না থাকায় পুরো কোচ ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।

এই সঙ্কট সবচেয়ে প্রকট আকার ধারণ করেছে ব্রডগেজ লাইনের কোচগুলোর ক্ষেত্রে। ঢাকামুখী বিভিন্ন আন্তঃনগর ট্রেনের এসব কোচ ঈদে যাত্রীচাপ সামাল দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু সময় মতো মেরামত না হওয়ায় ঈদে কম কোচ নিয়েই ট্রেন চালাতে হতে পারে, যা যাত্রীসেবায় বড় ধরনের সঙ্কট সৃষ্টি করবে।

রেলওয়ে কারখানা সূত্র আরো জানায়, অধিকাংশ প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে, বিশেষ করে ভারত, চীন ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করতে হয়। গত এক বছর ধরে এসব যন্ত্রাংশের আমদানি কার্যক্রম কার্যত বন্ধ থাকায় সঙ্কট তীব্র হয়েছে। আমদানির প্রক্রিয়া জটিল ও সময়সাপেক্ষ হওয়ায় দ্রুত সঙ্কট কাটার সম্ভাবনাও দেখা দিচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আনতে ন্যূনতম আরো এক বছর সময় লাগতে পারে। তত দিন এসব কোচ মেরামত করা কার্যত অসম্ভব।

এ বিষয়ে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক (ডিএস) শাহ সূফি নুর মোহাম্মদ বলেন, কারখানার পর্যাপ্ত উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ সঙ্কটের কারণে অধিকাংশ কোচ সময় মতো মেরামত করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর যন্ত্রাংশের ঘাটতি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি জানান, লোকবল সঙ্কট সত্ত্বেও কারখানাটি প্রতি দুই দিনে তিনটি যাত্রীবাহী ও তিনটি মালবাহী কোচ মেরামতের সক্ষমতা রাখে। কিন্তু যন্ত্রাংশ সময় মতো না পাওয়ায় সেই সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এতে রেলওয়ের রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি যাত্রীসেবাও ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, যন্ত্রাংশ ক্রয় ও আমদানির পদ্ধতি সহজ করা এবং আগাম মজুদ নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে রেলওয়ে ভবন, মন্ত্রণালয় ও সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগ প্রয়োজন। তবে স্থানীয়ভাবে সংগ্রহযোগ্য যন্ত্রাংশ দিয়ে যেসব কাজ করা সম্ভব, সেগুলো কারখানার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যথাসময়েই সম্পন্ন করছেন বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে নীলফামারী-৪ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য হাফেজ মাওলানা আব্দুল মুনতাকিম বলেন, সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা একটি ঐতিহ্যবাহী ও জাতীয় সম্পদ। যন্ত্রাংশ সঙ্কটে এর নিয়মিত কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি জানান, সঙ্কট নিরসনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দফতরের সাথে যোগাযোগ করে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে। ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনেই বিষয়টি সরকারের দৃষ্টিতে আনার প্রতিশ্রুতিও দেন এই সংসদ সদস্য।

সব মিলিয়ে, যন্ত্রাংশ সঙ্কট দ্রুত সমাধান না হলে আসন্ন ঈদে ট্রেন সেবায় বড় ধরনের চাপ পড়তে পারে। এতে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা যেমন ব্যাহত হবে, তেমনি সামগ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও ভোগান্তি বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।