মূল্যস্ফীতি ও প্রকৃত সুদের হারে ক্ষতি আমানতকারীর, ঋণগ্রহীতার উচ্চ ব্যয়
সুদের হার ও কর্মসংস্থান
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
ব্যাংকিং খাতের সুদের হার মূল্যায়নে নমিন্যাল বা নামমাত্র সুদের হার যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ প্রকৃত সুদের হার। কারণ আমানতকারী বা ঋণগ্রহীতার প্রকৃত লাভ-ক্ষতি নির্ধারিত হয় সুদের হার থেকে মূল্যস্ফীতির প্রভাব বাদ দেয়ার পর; অর্থাৎ কাগজে-কলমে যে সুদের হার দেখা যায়, বাস্তবে অর্থের ক্রয়ক্ষমতার বিচারে তার চিত্র ভিন্ন হতে পারে।
যদি ধরা হয়, ২০২৬ সালের মে মাসে গড় মূল্যস্ফীতি প্রায় ৮ শতাংশ, তাহলে ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক আমানতের গড় সুদের হার ছিল ৬.২২ শতাংশ। সে হিসাবে প্রকৃত আমানত সুদের হার দাঁড়ায় ঋণাত্মক ১.৮ শতাংশের কাছাকাছি; অর্থাৎ একজন আমানতকারী ব্যাংক থেকে সুদ পেলেও মূল্যস্ফীতির কারণে তার অর্থের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। সহজ ভাষায়, ব্যাংকে টাকা রেখে যে আয় হচ্ছে, বাজারে পণ্য ও সেবার মূল্যবৃদ্ধি সেই আয়ের চেয়ে দ্রুত হওয়ায় সঞ্চয়ের প্রকৃত মূল্য হ্রাস পাচ্ছে।
অন্য দিকে একই সময়ে গড় ঋণের সুদের হার ছিল ১১.৯২ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি বাদ দিলে প্রকৃত ঋণ সুদের হার দাঁড়ায় প্রায় ৩.৯ শতাংশ; অর্থাৎ ঋণগ্রহীতাদের জন্য অর্থায়নের প্রকৃত ব্যয় এখনো তুলনামূলকভাবে বেশি। বিশেষ করে উৎপাদনমুখী শিল্প, রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠান এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য এই উচ্চ প্রকৃত সুদের হার নতুন বিনিয়োগ ও উৎপাদন সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে থাকতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি সুস্থ অর্থনীতিতে এমন একটি ভারসাম্য প্রয়োজন, যেখানে আমানতকারীরা ইতিবাচক প্রকৃত মুনাফা পাবেন এবং একই সাথে উদ্যোক্তারাও সহনীয় ব্যয়ে ঋণ নিতে পারবেন। বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে সেই ভারসাম্য এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
স্প্রেড কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ব্যাংকিং খাতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত সূচকগুলোর একটি হলো ইন্টারেস্ট রেট স্প্রেড বা সুদ হারের ব্যাপ্তি। এটি মূলত ব্যাংকের গড় ঋণ সুদ এবং গড় আমানত সুদের পার্থক্য। সহজভাবে বলতে গেলে, ব্যাংক যে দামে অর্থ সংগ্রহ করে এবং যে দামে সেই অর্থ ঋণ দেয়- এই দুইয়ের ব্যবধানই স্প্রেড।
২০২৬ সালের মে মাসে দেশের ব্যাংকিং খাতে সামগ্রিক স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৫.৭০ শতাংশ, যা এপ্রিলে ছিল ৫.৭২ শতাংশ; অর্থাৎ এক মাসে কমেছে মাত্র ২ বেসিস পয়েন্ট। প্রথম দৃষ্টিতে পরিবর্তনটি খুবই ছোট মনে হলেও অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ সঙ্কেত। কারণ আমানত ও ঋণের সুদ প্রায় একই হারে সমন্বয় হওয়ায় ব্যাংকগুলোর নেট ইন্টারেস্ট মার্জিন বা সুদভিত্তিক আয় বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েনি। এর অর্থ হলো, ব্যাংকগুলো এক দিকে আমানতের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করছে, অন্য দিকে ঋণের সুদও ধীরে ধীরে সমন্বয় করছে ফলে লাভ ও প্রতিযোগিতার মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
তবে স্প্রেডকে কেবল মুনাফার সূচক হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত রয়েছে খেলাপি ঋণের ঝুঁকি, পরিচালন ব্যয়, মূলধনের খরচ, করের বোঝা এবং প্রভিশনিংয়ের প্রয়োজনীয়তা। ফলে কোনো ব্যাংকের স্প্রেড বেশি মানেই যে তার মুনাফা বেশি এমনটি সব সময় সত্য নয়।
চার ধরনের ব্যাংক, চার ধরনের ব্যবসায়িক মডেল
মে মাসের ডব্লিউএআইআর তথ্য ব্যাংকিং খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরে। সব ব্যাংক একই সুদের হারে ব্যবসা পরিচালনা করে না; বরং তাদের তহবিল সংগ্রহ, গ্রাহক কাঠামো এবং ঋণ বিতরণের ধরন অনুযায়ী স্প্রেডেও বড় পার্থক্য তৈরি হয়।
বিদেশী বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর গড় স্প্রেড ৮.৪০ শতাংশ, যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের স্প্রেড ৫.৬৪ শতাংশ, বেসরকারি ব্যাংকের ৫.৫৮ শতাংশ এবং বিশেষায়িত ব্যাংকের মাত্র ৩.৩১ শতাংশ; অর্থাৎ সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন স্প্রেডের মধ্যে ব্যবধান ৫.০৯ শতাংশ পয়েন্ট।
এই পার্থক্যের মূল কারণ ব্যাংকগুলোর ব্যবসায়িক দর্শন। বিদেশী ব্যাংকগুলো মূলত বড় করপোরেট ও আন্তর্জাতিক গ্রাহককেন্দ্রিক, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সরকারি আমানতনির্ভর, বেসরকারি ব্যাংক প্রতিযোগিতামূলক খুচরা ও করপোরেট বাজারে সক্রিয় এবং বিশেষায়িত ব্যাংক উন্নয়নমূলক অর্থায়নে নিয়োজিত। ফলে চারটি শ্রেণীর স্প্রেডের পার্থক্য আসলে চার ধরনের ব্যাংকিং মডেলের প্রতিফলন।
মূল্যস্ফীতি কমলে কী হতে পারে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- মূল্যস্ফীতি যদি ধারাবাহিকভাবে কমে, তাহলে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে?
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে নীতিগত সুদহার পুনর্বিবেচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রথমে কমতে পারে আন্তঃব্যাংক সুদের হার, এরপর ধীরে ধীরে আমানতের সুদ এবং পরবর্তী সময়ে ঋণের সুদ। তবে এই প্রক্রিয়া তাৎক্ষণিক নয়। কারণ ব্যাংকগুলো উচ্চ সুদে সংগৃহীত পুরনো মেয়াদি আমানতের দায় বহন করছে। ফলে নীতিগত সুদহার কমলেও ঋণের সুদ দ্রুত কমে আসবে- এমনটি আশা করা বাস্তবসম্মত নয়; বরং ধাপে ধাপে তহবিল খরচ কমার সাথে সাথে ঋণের সুদও সমন্বিত হবে।
এ কারণে মে মাসের তথ্যকে অনেক বিশ্লেষক ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে দেখলেও তারা একই সাথে সতর্ক করে বলছেন- এটি এখনো সুদের হার কমার নিশ্চিত সূচনা নয়; বরং স্থিতিশীলতার একটি প্রাথমিক ইঙ্গিত।
সুদের হার কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ার ইঙ্গিত মিললেও বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত চ্যালেঞ্জগুলো এখনো বহাল রয়েছে। উচ্চ খেলাপি ঋণ, কিছু ব্যাংকের তারল্য সঙ্কট, মূলধন ঘাটতি, দুর্বল করপোরেট সুশাসন এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা সুদের হার কমানোর প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলতে পারে।
একই সাথে ব্যাংকগুলোকে এক দিকে আমানতকারীদের আকৃষ্ট রাখতে প্রতিযোগিতামূলক সুদ দিতে হচ্ছে, অন্য দিকে বিনিয়োগে গতি আনতে ঋণের সুদও সহনীয় পর্যায়ে নামানোর চাপ রয়েছে। এই দুই লক্ষ্যকে সমন্বয় করাই আগামী মাসগুলোতে ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে।