জানাজা শেষে শাহবাগে ছাত্র-জনতার ঢল, ইনকিলাব মঞ্চের আলটিমেটাম

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদির শেষ বিদায়ে শোক, ক্ষোভ ও প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো রাজধানী। ওসমান হাদিকে গুলি করার পর এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও হত্যাকারীদের গ্রেফতার করা যায়নি। বিগত এক সপ্তাহে এ বিষয়ে সরকার কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে, এর ব্যাখ্যা দাবি করেছে ইনকিলাব মঞ্চ। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই ব্যাখ্যা দিতে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) মো: জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদাবক্স চৌধুরীকে সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে।

গতকাল শুক্রবার জানাজার আগ মুহূর্তে বক্তব্যে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের এ আলটিমেটাম দেন। সন্তোষজনক জবাব না পেলে শিক্ষার্থী-জনতাকে সাথে নিয়ে আরো কঠোর কর্মসূচিতে যাওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি।

আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও হাদির ওপর হামলাকারীকে গ্রেফতার করা হয়নি। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদাবক্স চৌধুরীকে সপ্তাহব্যাপী তাদের পদক্ষেপ সম্পর্কে জনগণকে জানাতে হবে। তা না হলে তাদের অবশ্যই পদত্যাগ করতে হবে ।

এ দিন বেলা সাড়ে ৩টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে ওসমান হাদিকে দাফনের পর জনসাধারণকে শাহবাগে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানায় ইনকিলাব মঞ্চ। এরপর থেকে শাহবাগে জড়ো হতে শুরু করেন তারা। এ সময় বিক্ষোভকারীদের ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা-ঢাকা’, ‘ভারতের দালালেরা, হুঁশিয়ার সাবধান’, ‘আমরা সবাই হাদি হবো, যুগে যুগে লড়ে যাবো’, ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাইরে’, ‘লীগ ধর, জেলে ভর’ ইত্যাদি স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। শাহবাগে জড়ো হওয়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থী, ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষ হাদির স্মরণে শোক প্রকাশের পাশাপাশি তার হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানান। স্লোগান, ব্যানার ও ফেস্টুনে হাদির সংগ্রামী জীবনের নানান বার্তা উঠে আসে।

জাবের বলেন, ওসমান হাদিকে একজন খুন করেনি। এর পেছনে একটি পুরো চক্র রয়েছে। বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলকে আমরা শুধু সন্দেহের চোখে দেখি না, আবার সন্দেহের বাইরে রেখেও দেখি না। ওসমান হাদির যে লড়াই, তাতে আওয়ামী লীগের সমস্যা তো আছেই, বাংলাদেশের কিছু রাজনৈতিক দলেরও সমস্যা আছে। তার সংগ্রাম আমাদের সুশৃঙ্খলভাবে জারি রাখতে হবে।

তিনি বলেন, ওসমান হাদিকে যারা খুন করেছে, পরিকল্পনা করেছে, সহায়তা করেছে এবং সার্বিক পরিস্থিতি তৈরি করেছে- তাদের প্রত্যেককে যেন অতি দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হয়, সেজন্য আমরা সরকারকে অনুরোধ করি। ওসমান হাদিকে খুন করার ১৭২ ঘণ্টা হয়ে গেছে, রাষ্ট্র এখনো বলতে পারেনি-তার খুনিরা কোথায়? তিনি বলেন, ওসমান হাদির রক্তের মধ্য দিয়ে ঘোষণা দিচ্ছি- খুনিদের সাথে কোনো সুশীলতা নেই। টকশোতে যারা খুনিদের পক্ষে কথা বলবে, তাদের সাথে আমরা নেই। বাংলাদেশের জনগণ তাদের প্রতিহত করবে। যারা এই খুনের পক্ষে বয়ান উৎপাদন করেছে, তাদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।

নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করতে নানা ষড়যন্ত্র হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সামনে নির্বাচন রয়েছে। নির্বাচনকে যাতে বাধাগ্রস্ত করা যায়, সে জন্য নানা ষড়যন্ত্র চলছে। নির্বাচন যেন না হয়, নির্বাচনে যেন আওয়ামী লীগ প্রত্যাবর্তন করতে পারে- সেই লক্ষ্যেই এই প্লট সাজানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন, তারা মনে করছে, এই মুহূর্তে কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকে হত্যা করলে তেমন কোনো ইমপ্যাক্ট তৈরি হবে না। কারণ জনগণের বিশ্বাস তাদের ওপর থেকে সরে গেছে। শুধু ওসমান হাদিই ছিল জনতার কণ্ঠস্বর- বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক, জুলাই জাগরণের প্রাণ। সুতরাং তাকে হত্যা করা হলে আওয়ামী লীগকে ব্যাক করা যাবে, তারা এমনটাই মনে করছে।

জাবের বলেন, বাংলাদেশে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো গত ১৭ বছরে কেউ যদি মাটির ৪০ ফুট নিচে লুকিয়েও থাকে, তাকে বের করেছে। তাহলে এখন তারা পারছে না কেন? এসব বুঝিয়ে লাভ নেই। আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে গুম কমিশনের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হবে। যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে কথা বলেছিল, যাদের গুম করা হয়েছে, খুন করা হয়েছে, সীমান্তে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে, সেসবের প্রতিবেদন প্রকাশ পাবে। তাই দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য আমাদের শান্ত থাকতে হবে। এ সময় তিনি ভাঙচুরে না জড়ানোর জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।

হাদির দাফন থেকে রাষ্ট্রীয় সম্মানে যেভাবে পাশে দাঁড়াল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অকুতোভয় যোদ্ধা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী শহীদ শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুতে শোকাহত পরিবার ও জাতির পাশে বহুমাত্রিক সহায়তা নিয়ে দাঁড়িয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। দাফন কার্যক্রম থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নিশ্চিত করা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং শোক পালনের মাধ্যমে শহীদ হাদির প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করেছে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ।

গতকাল শনিবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদসংলগ্ন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের মাজারের পাশে শহীদ হাদির দাফন সম্পন্ন হয়। এই দাফনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদন, স্থান নির্ধারণ এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, শহীদ হাদির পরিবারের অনুরোধ, ডাকসু নেতাদের প্রস্তাব, সরকারের নির্দেশনা এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সাথে আলোচনাসাপেক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট জাতীয় কবির মাজারসংলগ্ন এলাকায় দাফনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়। দাফন অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রোভিসিদ্বয়, কোষাধ্যক্ষ, প্রক্টরসহ শীর্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সরাসরি উপস্থিতি শহীদ হাদির প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক শ্রদ্ধা ও দায়বদ্ধতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দাফন কার্যক্রম নির্বিঘœ করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম সার্বিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করে। একই সাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে সমন্বয় করে পুরো এলাকা নিরাপত্তা বলয়ে রাখা হয়।

দাফনকালে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান, প্রোভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা, প্রোভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এম জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি অধ্যাপক মো: লুৎফর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমদ, আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েম, জিএস এস এম ফরহাদসহ বিভিন্ন অনুষদের ডিন, হল প্রভোস্ট, প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্য, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

এ ছাড়া শহীদ শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয় শোক পালনের অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিনব্যাপী শোক পালন করে। ভিসির ভবনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভবনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শোক প্রকাশ করা হয়।

দাফন শেষে ভিসি অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান, এই সম্মান শুধু একটি দাফনের সিদ্ধান্ত নয়; এটি শহীদ হাদির আদর্শ, সাহস এবং জাতির ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামে তার অবদানের প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশবাসীর সম্মিলিত স্বীকৃতি। শহীদ হাদির হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার দাবিতেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নৈতিক অবস্থান থেকে সোচ্চার থাকবে বলে জানান তিনি।

বিশ্লেষকদের মতে, দাফন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় শোক ও প্রকাশ্য অবস্থান- সব মিলিয়ে শহীদ শরিফ ওসমান হাদির প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সহায়তা ও সম্মান দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার সন্তানকে আজ বুকে টেনে নিয়েছে ঢাবি ভিসি : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান বলেছেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আজ তার এক সন্তানকে বুকে নিয়েছে। মা তার সন্তানকে আবার ফেরত পেয়েছে। আমরা তার জন্য দোয়া রাখি।’ শরিফ ওসমান হাদিকে নিয়ে এভাবেই অনুভূতি ব্যক্ত করেন ভিসি অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান। গতকাল বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে শহীদ শরিফ ওসমান হাদির দাফন শেষে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

ড. নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও জাতির ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামের অগ্রসৈনিক শহীদ শরিফ ওসমান হাদির দাফন আজ সম্পন্ন হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আজ তার এক সন্তানকে মায়ের মতো বুকে টেনে নিয়েছে। তিনি আরো বলেন, শহীদ হাদি এখন আর শুধু একজন ব্যক্তি নন- তিনি ইতিহাস, তিনি বাংলাদেশের ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তার মৃত্যুতে মানুষের যে গভীর ভালোবাসা ও আবেগ প্রকাশ পেয়েছে, তা প্রমাণ করে আধিপত্যবাদ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়সঙ্গত সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে পুরো বাংলাদেশ সবসময় একাত্ম।

তিনি বলেন, এই কবরস্থানে সমাধিস্থ হওয়ার সুযোগ খুব অল্পসংখ্যক সৌভাগ্যবান মানুষের হয়, যা শহীদ ওসমান হাদির হয়েছে। এটি তার অবদানের প্রতি জাতির গভীর শ্রদ্ধার প্রতিফলন। তিনি আরো বলেন, এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বরং পুরো দেশবাসীর পক্ষ থেকে শহীদ ওসমান হাদিকে সম্মান জানানো হলো। আমরা আশা করি, তার আদর্শ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে। হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রসঙ্গে অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, এই নির্মম হত্যাকাণ্ড কোনো সাধারণ অপরাধ নয়; এটি একটি আদর্শকে স্তব্ধ করার অপচেষ্টা। তিনি দ্রুত হত্যাকারীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় এনে পূর্ণাঙ্গ বিচার নিশ্চিত করার জোর দাবি জানান এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এই সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

এ দিকে শহীদ ওসমান হাদির মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয় শোক পালনের অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ শোক পালন করা হয়। এ উপলক্ষে ভিসির ভবনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভবনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়।