চৈত্রের যুদ্ধ

Printed Edition
agdum-2
চৈত্রের যুদ্ধ

আল আমিন মুহাম্মাদ

চৈত্রের আকাশটা আজ নীল নয়, যেন তপ্ত তামাটে থালা। খাঁ খাঁ রোদে ফেটে চৌচির হয়ে আছে মাঠের বুক। দিগন্তের ঝাপসা বাতাসে আগুনের হলকা নাচে। এই অগ্নিস্নাত দুপুরের মাঝখানে কোমর বেঁধে দাঁড়িয়ে আছেন রেজা মিয়া। পাশে তার ছোট্ট ছায়াসঙ্গীÑ দশ বছরের ছেলে তাহসিন।

রেজা মিয়ার কপালে ঘাম জমে নোনা জল হয়ে চোখে পড়ছে। লুঙ্গির গিঁটটা কষে দিয়ে তিনি তপ্ত ধুলোয় পাটের বীজ ছিটানো শুরু করলেন। তাহসিন তার ছোট ছোট দুই হাতে বীজের পলিথিনটা বুকের সাথে লেপ্টে ধরে রেখেছে। সে ক্লাস ফোরে পড়ে। স্কুল বন্ধ, তাই বাবার এই অসম লড়াইয়ে সে আজ ভাগীদার।

তাহসিন নিচের দিকে তাকিয়ে শিউরে ওঠে। মাটিটা এতটাই তেতে আছে যে মনে হয় এখনই ধোঁয়া উঠবে। সে বাবার ঘর্মাক্ত পিঠের দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলল, ‘বাবা, মাটি তো আগুনের মতো ছ্যাঁকা দিচ্ছে! বীজগুলো কি ভেতরে পুড়ে কয়লা হয়ে যাবে?’

রেজা মিয়া এক মুহূর্ত থামলেন। ছেলের কচি মুখটা রোদে লাল টকটকে হয়ে গেছে, যেন এখনই ফেটে পড়বে। তিনি নিজের ময়লা গামছা দিয়ে ছেলের মুখটা মুছে দিয়ে বললেন, ‘না রে বাজান, এই আগুনেই সোনার জন্ম হয়। পুড়লে তবেই তো খাঁটি হবে। তবে আল্লা যদি রহম করে একটু মেঘ পাঠাতেন, তবে এই দানাগুলো প্রাণ পেত।’

তাহসিন আকাশের দিকে তাকাল। কোথাও এক ফোঁটা মেঘের চিহ্ন নেই। সে সবকিছু ‘অল্প অল্প’ বোঝে। সে বোঝে যে বাড়িতে চালের ড্রামটা খালি হতে শুরু করেছে; সে বোঝে বাবার ছেঁড়া গামছাটা আর ঘাম মুছতে পারছে না। কিন্তু সে এটা বোঝে না যে, কেন আকাশটা এত নিষ্ঠুর হয়ে হাসছে।

‘বাবা, আমি একটু পানি ছিটিয়ে দেবো?’ তাহসিন তার ছোট্ট মগটা বের করে করুণ স্বরে জিজ্ঞেস করল।

রেজা মিয়ার শুকনো ঠোঁটে এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠল। এক বুক হাহাকার লুকানো সেই হাসি। তিনি তাহসিনের মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘তোর ওইটুকু মগের পানিতে কি আর এই তৃষ্ণার্ত মাঠ ভিজবে রে পাগল? আমাদের ভরসা এখন শুধু আসমানের মালিকের রহমতের।’

বাবা-ছেলে মিলে দীর্ঘক্ষণ কাজ করলেন। রেজা মিয়া যখন লাঙল টানছিলেন, তাহসিন পেছনে পেছনে গিয়ে তার ছোট ছোট আঙুল দিয়ে মাটি সমান করে দিচ্ছিল। হঠাৎ একটা ধারালো মাটির চাবড়ায় তাহসিনের পায়ে চোট লাগল। সে ‘উফ’ করে ধুলোর ওপর বসে পড়ল।

রেজা মিয়া কাজ ফেলে ছুটে এলেন। ‘কি হলো রে বাপ আমার?’

তাহসিন চোখের জল আড়াল করে হাসার চেষ্টা করল। ‘কিছু না বাবা, অল্প একটু লেগেছে। আমি তো এখন বড় হয়েছি, তাই না? তোমার সাথে যুদ্ধ করছি!’

ছেলের মুখে ‘যুদ্ধ’ শব্দটা শুনে রেজা মিয়ার বুকটা হাহাকার করে উঠল। যে বয়সে তাহসিনের গোল্লাছুট খেলার কথা, সেই বয়সে সে দারিদ্র্যের সাথে কুস্তি লড়ছে। তিনি ছেলেকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে আইলের ধারে একটি বুড়ো নিম গাছের ছায়ায় বসালেন।

‘শোন তাহসিন,’ রেজা মিয়া গাঢ় স্বরে বললেন, ‘এই যে তুই কষ্ট করছিস, এই ঘামগুলো বৃথা যাবে না। মাঠ যখন সোনালি পাটে ভরে যাবে, তখন আমাদের সব আকাল কেটে যাবে। তোর জন্য নতুন জামা আনব, তোর স্কুলের সব খাতা কিনে দেব। দেখিস!’

তাহসিন বাবার ঘামে ভেজা তপ্ত বুকে মাথা রাখল। সে অল্প অল্প বোঝে যে বাবা তাকে স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। সেই স্বপ্নের ঘ্রাণ ঠিক সদ্য বোনা বীজের মতো, মাটির গভীর অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা এক বুক জ্যান্ত আশা।

বিকেলের পড়ন্ত রোদে বাবা আর ছেলে হাত ধরাধরি করে বাড়ির পথে পা বাড়াল। পেছনে পড়ে রইল তপ্ত মাঠ আর তাদের হাড়ভাঙা খাটুনির ইতিহাস। ঠিক সেই মুহূর্তে উত্তর কোণে এক টুকরো তামাটে মেঘ নীল হতে শুরু করল।

তাহসিন চিৎকার করে উঠল, ‘বাবা! দেখো, মেঘ! আমাদের বীজগুলো এবার প্রাণ পাবে!’

রেজা মিয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে দুই হাত তুললেন। দারিদ্র্যের সাথে এই অসম যুদ্ধে আজ যেন প্রকৃতির মায়া নেমে আসছে। চৈত্র মাসের সেই তপ্ত বিকেলে এক চিলতে শীতল বাতাস বয়ে গেল। তাহসিন আর রেজা মিয়ার ধুলোমাখা মুখে ফুটে উঠল এক চিলতে অমলিন সুখ, যা পৃথিবীর কোনো ঐশ্বর্য দিয়ে কেনা সম্ভব নয়। হ