বিজয় দিবসে জামায়াতের যুব ম্যারাথন

আগামীর বাংলাদেশ পরিচালিত হবে নতুন ব্যবস্থার রাজনীতিতে : ডা: শফিক

Printed Edition
first-3
বিজয় দিবস উপলক্ষে রাজধানীতে জামায়াতে ইসলামীর যুব ম্যারাথনে দলের আমির ডা: শফিকুর রহমান : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, পুরনো ব্যবস্থার রাজনীতি ছুড়ে ফেলে দিয়ে নতুন ব্যবস্থার রাজনীতিতে আগামীর বাংলাদেশ পরিচালিত হবে। যেই রাজনীতি হবে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে, খুনের বিরুদ্ধে, ধর্ষণের বিরুদ্ধে, মামলাবাজদের বিরুদ্ধে, দুর্নীতি-অন্যায়-অনাচারের বিরুদ্ধে।

১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস উদযাপনে জামায়াতে ইসলামীর যুব বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত যুব ম্যারাথন কর্মসূচির উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন। এ সময় তিনি আরো বলেন, তারুণ্যের নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত ম্যারাথন চলবেই। যত বাধা, ভয়ভীতি আসুক আমরা থেমে যাবো না। আমরা জাতির স্বপ্নের নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ করব, ইনশা আল্লাহ।

তিনি বলেন, আগামীর নির্বাচনে কোনো ধরনের কারিগরি ষড়যন্ত্র জনগণ হতে দেবে না। আমরা নির্বাচন কমিশনের কাছে কোনো আনুকূল্য চাই না, কিন্তু কমিশন যদি কারো প্রতি আনুকূল্য দেখায় তবে সেটি বরদাশত করা হবে না। কালো টাকায় কেউ মানুষকে কেনার চেষ্টা করলে মানুষ মুখে ছাঁই মেরে দেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। দেশপ্রেমে উজ্জীবিত জাতিকে কেউ কালো টাকায় কিনতে পারবে না।

জামায়াত আমির বলেন, পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের ওপর অবিচার করার কারণে, বৈষম্যের সৃষ্টি করায় মানুষ ফুঁসে উঠেছিল। যারা সত্তরের নির্বাচনে নির্বাচিত হয়েছিল, তারা জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বৈষম্যহীন শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলবেন। কিন্তু দেশ স্বাধীনের পর তারা ক্ষমতায় বসে তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছিল। তারা বহুদলীয় গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়েছিল, সংবাদপত্র বন্ধ করে দিয়েছিল, মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। রক্ষী বাহিনী গঠন করে যখন যাকে ইচ্ছে তাকে খুন করা হয়েছিল, মা-বোনদের ইজ্জত লুন্ঠন করা হয়েছিল। বাকশাল কায়েমের মাধ্যমে পরিবারতন্ত্রের শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের ছেলেরা ব্যাংক ডাকাতি করেছিল। বিদেশী দাতা সংস্থাদের দান করা খাদ্যসামগ্রী ও অর্থ লুট করা হয়েছিল। তাদের সাড়ে চার বছরের দুঃশাসন মানুষকে বিদ্রোহী করে তুলেছিল। কে তাদেরকে হত্যা করেছিল?- একাত্তরের রণাঙ্গনে নেতৃত্ব দেয়া জাতীয় বীরদের হাতেই তারা হত্যার শিকার হয়েছিল। কেন হত্যার শিকার হয়েছে সেই উত্তর আওয়ামী লীগকেই খুঁজতে হবে। ৭২-এর ১০ জানুয়ারি, ৯৬ এর ১০ জানুয়ারি, ২০০৯ সালের ৭ জানুয়ারি তারা তিনবার ক্ষমতায় এসেছে। ৯৬ সালে তারা ক্ষমতায় আসার আগে অতীতে তাদের দল যেই খুন করেছে, জুলুম করেছে তা স্বীকার করে জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছিল। জনগণ সরল বিশ্বাসে তাদেরকে ক্ষমতায় বসানোর পর তারা আবার নিজের রূপে ফিরে আসে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামে গিয়ে ঘোষণা দিয়েছিলেন তার দলের একজন মারা গেলে ১০ জনকে হত্যা করা হবে। একজন প্রধানমন্ত্রী কতটা দায়িত্ব জ্ঞানহীন হলে এমনটি বলতে পারেন। সেই সময় তারা মানুষকে হত্যা করে খাল-বিলে লাশ ফেলেছে। পরবর্তীতে তারা ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টন মোড়ে মানুষকে সাপের মতো পিটিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেছে। শুধু তা-ই নয়, হত্যার পর তারা লাশের ওপর নৃত্য করেছিল। যেই দৃশ্য দেখে পুরো বিশ্ব ব্যথিত হয়েছে। ২০০৯ সালে আবার ক্ষমতায় এসে তারা প্রথমেই পিলখানা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল। একে একে তারা জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে হত্যা করেছিল। শাপলা চত্বরে এ দেশের আলেম-ওলামাদের হত্যা করেছিল। তাদের শাসনামলের ১৫ বছরে এমন কোনো জনপদ নেই যেখানে আওয়ামী লীগের জুলুম থেকে মানুষ রক্ষা পেয়েছে। যার কারণে জুলাই আন্দোলনে তাদের বিরুদ্ধে পুরো দেশবাসী ফুঁসে উঠেছিল। তারা জনরোষের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে দেশ থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। এখন তারা পলাতক থেকেই চোরাগোপ্তা হামলা চালাচ্ছে। তাদের টার্গেট এখন এ দেশের তরুণ ও বিপ্লবীরা। সেই টার্গেটের অংশ হিসেবে তারা জুলাইয়ের অন্যতম শীর্ষ নেতা ওসমান হাদিকে হত্যা চেষ্টা করেছে। ওসমান হাদির কিছু হলে বিপ্লবীরা বসে থাকবে না। আওয়ামী লীগ ভেবেছে ওসমান হাদিকে শেষ করতে পারলে কিংবা কয়েকজন বিপ্লবীকে শেষ করতে পারলে তারা সফল হবে, কিন্তু না! বিপ্লবীর সংখ্যা তারা কমাতে পারবে না। বরং ক্রমেই বিপ্লবী তরুণদের সংখ্যা বাড়বে। তরুণরা আওয়ামী লীগের সব অপশক্তি রুখে দিতে প্রস্তুত রয়েছে। জামায়াত আমির উপস্থিত যুবসমাজকে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের সভাপতিত্বে এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি মোহাম্মদ কামাল হোসেনের পরিচালনায় যুব ম্যারাথন কর্মসূচির উদ্বোধনী সভায় আরো বক্তৃতা করেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমির অ্যাডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি ডা: ফখরুদ্দিন মানিক প্রমুখ।

উদ্বোধনী সভা শেষে যুব ম্যারাথনে অর্ধ লাখ যুবক অংশ নেন। ম্যারাথনটি সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে শুরু করে শাহবাগ-সাইন্সল্যাব হয়ে মানিক মিয়া এভিনিউতে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে এক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ভারত আমাদের স্বাধীনতা নয়, বরং পাকিস্তানের সাথে ১৯৬৫ সালে যুদ্ধে লজ্জাজনক পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে আমাদেরকে সহযোগিতা করেছিল। তারা আমাদের দেশের স্বাধীনতার-সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি না দিয়ে আওয়ামী বাকশালীদের মাধ্যমে দেশকে করদরাজ্যে পরিণত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছিল। কিন্তু আগস্ট বিপ্লবের মাধ্যমে সে অবস্থার অবসান হয়েছে।

সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের জামায়াত মনোনীত সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১৪ আসনের জামায়াত মনোনীত সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী মোবারক হোসাইন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের নায়েবে আমির আবদুর রহমান মূসা, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি নাজিম উদ্দীন মোল্লা, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি কামাল হোসাইন ও ড. আবদুল মান্নান, ঢাকা-১৮ আসনের জামায়াত মনোনীত সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী অধ্যক্ষ আশরাফুল হক, ঢাকা-১৭ আসনের প্রার্থী ডা: এস এম খালিদুজ্জামান, ঢাকা-১৬ আসনের প্রার্থী কর্নেল (অব:) আবদুল বাতেন, ঢাকা-৬ আসনের প্রার্থী জয়নাল আবেদীন প্রমুখ।

তরুণ প্রজন্ম ভিনদেশীদের দাদাগিরি মেনে নেয়নি, নেবে না -অধ্যাপক মুজিবুর : ৫৫তম মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের উদ্যোগে শহীদ ও আহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠান গতকাল মহানগরীর হলরুমে অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান। এতে সভাপতিত্ব করেন কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমির আবদুস সবুর ফকির। অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম ভিনদেশীদের দাদাগিরি মেনে নেয়নি, নেবে না। যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছিনতাই করে নিজেদের স্বাধীনতা দাবি করে তারা আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে না, বিশ্বাস করে না।