শোকাবহ দিনে সিরিজ জয়ের ইতিহাস

জসিম উদ্দিন রানা
Printed Edition
1st-2
উইকেট নেয়ার পর বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটারদের উল্লাস : নয়া দিগন্ত

বুক ভরা অসীম প্রেরণাটা এসেছে শ্রীলঙ্কা থেকে। শেষ টি-২০ সিরিজে লঙ্কানদের ঘরের মাঠে ২-১ এ হারিয়ে সিরিজ জিতে বাংলাদেশ। সে ধারাবাহিকতায় এবার নিজেদের ঢেরায় পাকিস্তানকে প্রথম ম্যাচে ৭ উইকেটে হারিয়ে ইতিহাস গড়ার সূচনাটা তৈরি করে রেখেছিল লিটন বাহিনী। গতকাল দ্বিতীয় ম্যাচে চ্যালেঞ্জিং কাব্যটা রচনা করার পথেই ছিল বাংলাদেশ। কিন্তু ভোগালো লেজের দিকের ব্যাটার ফাহিম আশরাফ, আব্বাস আফ্রিদি ও আহমেদ ড্যানিয়েলরা। ১৯তম ওভারে ম্যাচের রঙ পাল্টাতে শুরু করে। ফাহিম আশরাফ কাঁপন ধরিয়ে দেন বাংলাদেশ শিবিরে। ম্যাচ হেলে যায় পাকিস্তান শিবিরে। রিশাদকে বাউন্ডারি হাঁকিয়ে বাংলাদেশের শিরায় রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে দেন ফাহিম। পরের বলেই বোল্ড হওয়ায় স্বস্তি। তখন জয়ের জন্য দরকার এক ওভারে ১৩ রান। মোস্তাফিজের বলে চার মেরে বাংলাদেশের স্বপ্নকে নাজুক করে দেন ড্যানিয়েল। পরের বলেই উড়িয়ে মারতে গিয়ে বাউন্ডারিতে শামিমকে ক্যাচ দেন। ১৯.২ ওভারে ১২৫ রানে অলআউট সফরকারীরা। তাতেই শ্রীলঙ্কার পর প্রথমবারের মতো পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ৮ রানের জয়ে টি-২০ সিরিজ নিজেদের করে নিল বাংলাদেশ।

টি-২০তে ১৩৩ মোটেও বড় স্কোর নয়, কিন্তু খেলা যখন মিরপুরের শেরেবাংলায় তখন তো চ্যালেঞ্জিং বলতেই হয়। জাকের আলি অনিকে দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ ২০ ওভারে তুলেছে ১৩৩ রান। জবাবে ৪ বল বাকি থাকতে ১২৫ রানে অল আউট পাকিস্তান। বাংলাদেশের জয় ৮ রানে এবং তিন ম্যাচ সিরিজে ২-০ তে জিতল লিটনরা। ম্যাচ সেরা অবশ্যই ৫৫ রান করা জাকের আলি অনিক।

গতকাল শোকাবহ দিনে টস ভাগ্য সাথে ছিল না। শুরুতে ব্যাটিংয়ে নেমে পাকিস্তানের বোলিং তোপে কোণঠাসা হয়ে পড়ে বাংলাদেশ। এর মধ্যে লড়াই করেন জাকের আলি। তার ব্যাটে ৪৮ বলে ৫৫ রান। সাথে শেখ মাহেদী হাসানও দেখালেন দাপট। তিনি থামেন ২৫ বলে ৩৩ রান তুলে। অন্যরা উইকেটে আসা আর যাওয়ার দায়টুকু যেন সারলেন!

মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে শোকের আবহে মাঠে নেমে সিরিজের দ্বিতীয় টি-২০তে ব্যাট হাতে দলকে বিপর্যয় থেকে টেনে তোলার নায়ক জাকের। তার ৫৫ রানের কার্যকর ইনিংসে ভর করেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ পেয়েছে স্বাগতিকরা। টস জিতে প্রথমে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন পাকিস্তান অধিনায়ক সালমান আলি আগা।

মাত্র ৫ রানে প্রথম উইকেট হারায় বাংলাদেশ। একে একে ফিরে যান মোহাম্মদ নাঈম (৩), লিটন দাস (৮), তৌহিদ হৃদয় (০) ও পারভেজ হোসেন ইমন (১৩)। মাত্র ২৮ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় স্বাগতিক শিবির। এতসব ধাক্কার মাঝেও মাথা ঠাণ্ডা রেখে ইনিংস মেরামতের কাজ শুরু করেন জাকের আলি অনিক ও শেখ মাহেদী হাসান। এই দু’জনের ব্যাটেই গতি পায় ইনিংস। মাহেদী খেলেন ২৫ বলে ৩৩ রানের কার্যকর ইনিংস। তাদের জুটিতেই ৮০ রানের ঘর পেরোয় বাংলাদেশ। তবে এরপর আর কেউ দাঁড়াতে পারেননি। শেষদিকে কিছু রান যোগ করেন রিশাদ (৮) ও তানজিম হাসান সাকিব (৭)। ইনিংসের শেষ বলে আউট হন জাকের আলি। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ অলআউট হয় নির্ধারিত ২০ ওভারে ১৩৩ রানে। পাকিস্তানের হয়ে বল হাতে সালমান মির্জা (২/১৭), আহমেদ দানিয়াল (২/২৩) ও আব্বাস আফ্রিদি (২/৩৭)। একটি করে উইকেট পান মোহাম্মদ নওয়াজ ও ফাহিম আশরাফ।

উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে প্রাণহানির ঘটনায় শোকস্তব্ধ পুরো দেশ। এই প্রেক্ষাপটে খেলোয়াড়রা কালো আর্মব্যান্ড পরে মাঠে নামেন। বিসিবির উদ্যোগে খেলার আগে ১ মিনিট নীরবতা পালন, জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ গতকাল দু’টি পরিবর্তন এনেছে। বাদ পড়েছেন তানজিদ হাসান তামিম ও তাসকিন আহমেদ। একাদশে ফিরেছেন মোহাম্মদ নাঈম শেখ ও শরিফুল ইসলাম।

জবাবে খেলতে নেমে বাংলাদেশের ইনিংসের মতোই পাকিস্তানের ইনিংসও ছিল অনেকটা মন্থর। বল থমকে এসেছে কিছুটা, বাউন্স ছিল অসমান। তারপরও ১৩৪ রানের লক্ষ্য নাগালের বাইরে ছিল না। কিন্তু সেই লক্ষ্যই ভীষণ দুরূহ হয়ে ওঠে বাংলাদেশের দুর্দান্ত বোলিংয়ে। প্রথম উইকেটটি ছিল উপহার। প্রথম ওভারেই রান আউট সাইম আইয়ুব। এরপর শরিফুল ইসলামের শিকার মোহাম্মাদ হারিস ও ফখর জামান। তানজিম হাসানের দুর্দান্ত দু’টি ডেলিভারিতে পরপর দুই বলে শূন্যতে শেষ হাসান নাওয়াজ ও মোহাম্মাদ নাওয়াজ। পঞ্চম ওভারেই ১৫ রানে তখন ৫ উইকেট নেই পাকিস্তানের!

এই সংস্করণে এত কম রানে ৫ উইকেট হারানোর নজির তাদের আর নেই। বাংলাদেশেরও এত কম রানে ৫ উইকেট অর্জনের কীর্তি এটি প্রথম। এরপর কিছুটা বিরতি। তবে স্বস্তি ফেরেনি পাকিস্তানের। অধিনায়ক সালমান আলি আগার (২৩ বলে ৯) রানের যন্ত্রণাময় উপস্থিতি শেষ করেন মাহেদী। পাকিস্তানের প্রথম ছয় ব্যাটসম্যানের সম্মিলিত রান ১৮! একটু পর খুশদিল শাহকেও (১৩) ফেরান মাহেদী। পাকিস্তানের রান তখন ৭ উইকেটে ৪৭। সেই ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়েও জয়ের ছবি আঁকছিলেন ফাহিম আশরাফ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দলকে জেতাতে পারেননি।

সংক্ষিপ্ত স্কোর :

বাংলাদেশ : ১৩৩ (নাঈম ৩, পারভেজ ১৩, লিটন ৮, হৃদয় ০, জাকের ৫৫, মাহেদী ৩৩, শামীম ১, তানজিম ৭, রিশাদ ৮, শরিফুল ১, মোস্তাফিজ ০*; সালমান মির্জা ২/১৭, ফাহিম ১/২০, ড্যানিয়েল ২/২৩, নাওয়াজ ১/১৯, আফ্রিদি ২/৩৭)।

পাকিস্তান : ১৯.২ ওভারে ১২৫ (ফাখার ৮, সাইম ১, হারিস ০, সালমান আলি আগা ৯, হাসান নাওয়াজ ০, মোহাম্মাদ নাওয়াজ ০, খুশদিল ১৩, আফ্রিদি ১৯, ফাহিম ৫১, ড্যানিয়েল ১৭; মাহেদী ২/২৫, শরিফুল ৩/১৭, মোস্তাফিজ ১/১৫ , তানজিম ২/২৩, রিশাদ ১/৪২)।

ফল : বাংলাদেশ ৮ রানে জয়ী।

সিরিজ: তিন ম্যাচ সিরিজে বাংলাদেশ ২-০তে এগিয়ে।

ম্যাচ সেরা : জাকের আলি।