চায়ের দেশে আমের মুকুলের সুবাস, সমন্বিত কৃষি বিপ্লব

Printed Edition
bangla-5
চায়ের দেশে আমের মুকুলের সুবাস, সমন্বিত কৃষি বিপ্লব

পঞ্চগড় প্রতিনিধি

উত্তরের সীমান্ত জেলা পঞ্চগড়ের সমতলে চা চাষের বিপ্লব আগেই ঘটেছিল। এবার সেই চা বাগানের ভেতরেই ‘সাথি ফসল’ হিসেবে আম চাষ করে নতুন এক সফলতার গল্প লিখছেন ৭০ বছর বয়সী কৃষক বসিরুল আলম প্রধান। স্থানীয়ভাবে ‘আলম চেয়ারম্যান’ নামে পরিচিত এই নিভৃতচারী মানুষটি ২২ একর জমিতে গড়ে তুলেছেন চা ও বিদেশের হরেক জাতের আমের এক বিশাল সমন্বয়। তার এই উদ্ভাবনী কৃষি মডেল এখন জেলার অন্য চাষিদের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরেজমিন সদর উপজেলার দেওয়ান হাট এলাকার মহানগর পাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, মাইলের পর মাইল বিস্তৃত সবুজ চা বাগান। তবে এই বাগানের বৈশিষ্ট্য হলো, নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর দাঁড়িয়ে আছে থোকায় থোকায় মুকুল আসা আমগাছ। সাধারণত চা বাগানে কড়া রোদ থেকে চারা রক্ষায় ‘শেড ট্রি’ হিসেবে কড়ই বা অন্য গাছ লাগানো হয়। কিন্তু বসিরুল আলম সেই চিরাচরিত ধারণা বদলে সেখানে লাগিয়েছেন শতাধিক জাতের বিদেশী আম।

জানা যায়, বসিরুল আলম প্রধান পঞ্চগড় সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান। রাজনীতির পাশাপাশি মাটি ও মানুষের সাথে তার সখ্য দীর্ঘদিনের। ২০২৪ সালে তিনি দেশের সেরা ‘ক্ষুদ্র চা চাষি’ হিসেবে জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত হন। চায়ের সাফল্যের পর তিনি নজর দেন আম চাষে। তিনি জানান, চা বাগানের ফাঁকা জায়গাগুলো কাজে লাগিয়ে বাড়তি আয়ের লক্ষ্যেই এই আম বাগান করা।

সাফল্যের খতিয়ানও বেশ ঈর্ষণীয়। ২০২৪ সালে চা বাগানের সাথি ফসল হিসেবে আম বিক্রি করেই তিনি আয় করেছিলেন প্রায় ৪০ লাখ টাকা। ২০২৫ সালে আমের বাজারদর ও ফলন ভেদে ভালো লাভ ঘরে তোলেন। চলতি ২০২৬ মৌসুমে প্রতিটি গাছ মুকুলে ভরে গেছে। বাগানে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ; শ্রমিকরা ব্যস্ত গাছের গোড়ায় পানি দেয়া ও পরিচর্যায়। বর্তমানে প্রতি কেজি কাঁচা চা-পাতা ৩৬ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, যার পাশাপাশি আমের এই বাড়তি আয় তার খামারের অর্থনৈতিক ভিতকে করেছে আরো শক্তিশালী।

বসিরুল আলম প্রধান বলেন, আমি কৃষিকে শুধু পেশা নয়, ভালোবাসা দিয়ে করি। প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে কিছু আমগাছ লাগিয়েছিলাম। ফলন ভালো হওয়ায় এখন পরিকল্পিতভাবে বাগানটি সাজিয়েছি। আমার মূল লক্ষ্য হলো তরুণদের কৃষিকাজে আগ্রহী করে তোলা। আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ করলে মাটি কখনো কাউকে বিমুখ করে না।’

এ বিষয়ে ব্র্যাক নার্সারির ম্যানেজার আশিকুর রহমান বলেন, ‘বসিরুল সাহেব অত্যন্ত উদ্ভাবনী চিন্তার মানুষ। চা ও আমের এই সমন্বিত চাষপদ্ধতি কৃষকদের জন্য অত্যন্ত লাভজনক। আমরা নিয়মিত তাকে কারিগরি পরামর্শ দিয়ে আসছি।’

পঞ্চগড় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক আব্দুল মতিন বলেন, ‘চা বাগানে শেড ট্রি হিসেবে ফলদ গাছ লাগানো একটি চমৎকার বুদ্ধি। অনেক সময় চায়ের দাম ওঠানামা করে, তখন এই সাথি ফসল চাষিদের আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বড় ভূমিকা রাখে। এই সমন্বিত বাগানটি জেলার কৃষি অর্থনীতির অনন্য উদাহরণ।’

সবুজ চায়ের গালিচার ওপর বিদেশী আমের এই সমারোহ দেখতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসছেন। পঞ্চগড়ের সমতল ভূমিতে যে কত বৈচিত্র্যময় ফসল ফলানো সম্ভব, বসিরুল আলম প্রধান তা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন।