বাণিজ্য চুক্তির বাস্তবায়নে পল কাপুরের গুরুত্বারোপ
চুক্তিতে বিএনপি-জামায়াত সম্মতি দিয়েছিল : পররাষ্ট্রমন্ত্রী
Printed Edition
কূটনৈতিক প্রতিবেদক
যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য সই হওয়া পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির বিধান বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। অন্য দিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বিশেষ করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সরকারের নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন।
গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ড. খলিলুর রহমানের সাথে পল কাপুরের বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসন, পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে পল কাপুর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তিনি গত মঙ্গলবার রাতে দুই দিনের সফরে দিল্লি থেকে ঢাকা এসে পৌঁছান। গতকাল সকালে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকের পর তিনি সরকারের মন্ত্রীদের সাথে সিরিজ বৈঠক করেছেন। বিএনপি সরকার গঠনের পর এটি যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রথম উচ্চ পর্যায়ের সফর।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশের ওপর আরোপিত যুক্তরাষ্ট্রের ৩৭ শতাংশ পারস্পরিক বা অতিরিক্ত শুল্ক মোকাবেলায় দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে গত ৯ ফেব্রুয়ারি এই শুল্ক ১৯ শতাংশে নামিয়ে এনে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তি সই করে বাংলাদেশ। তবে চুক্তির শর্তগুলো প্রকাশিত হলে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্ট হয়। এতে বাংলাদেশের স্বার্থ গুরুতরভাবে ক্ষুণœ হয়েছে বলে অর্থনীতিবিদরা অভিযোগ তুলে তা বাতিলের আহ্বান জানান।
বৈঠক শেষে পল কাপুর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কথা বলেনি। শুধু বলেছেন, ভাল আলোচনা হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, সদ্য অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন এতটা শান্তিপূর্ণ ও অবাধ হবে, এমনটা ভাবেনি যুক্তরাষ্ট্র। পল কাপুর আমাকে বলেছেন- আমার মনে আছে, আপনি ওয়াশিংটন সফরে বলেছিলেন যে এই নির্বাচনকে উৎসবমুখর করতে চান। তখন আমরা ভেবেছিলাম আদৌ কি তাই হবে? পরে আমরা দেখলাম, আসলেই একটি উৎসবমুখর নির্বাচন হয়েছে।
মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে আলোচনা প্রসঙ্গে খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের স্বার্থরক্ষা করেই কোনো দেশের সাথে সম্পর্ক এগিয়ে নেবে সরকার। যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের মর্যাদার সাথে ফিরিয়ে আনতে চায় ঢাকা। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে যে অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া হবে তা বহনের ক্ষমতা বাংলাদেশের জন্য দুঃসাধ্য। আমি বলেছি, যুক্তরাষ্ট্র যেন আলোচনার মাধ্যমে এবং কূটনীতিকে সুযোগ দিয়ে যত দ্রুত সম্ভব মধ্যপ্রাচ্যে সঙ্ঘাত বন্ধ করার চেষ্টা চালায়।
এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পল কাপুরের সাথে আমার বৈঠকে প্রতিরক্ষার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়নি। বৈঠকে ‘জিসোমিয়া’ বা ‘আকসা’ শব্দ দু’টি উচ্চারিত হয়নি।
প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্র জিসোমিয়া ও আকসা নামের দু’টি সামরিক চুক্তি সই করার জন্য বাংলাদেশকে বহুদিন ধরে তাগাদা দিয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র কেনার জন্য এই চুক্তি সইয়ের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে ভূরাজনীতি বিবেচনায় বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে ‘ধীরে চল’ নীতি অনুসরণ করছে।
বৈঠক সম্পর্কে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, আলোচনায় উভয়পক্ষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক সম্পর্কসহ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো জোরদার করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। খলিলুর রহমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকারের ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতির ওপর জোর দেন। তিনি জাতীয় স্বার্থ এবং অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারদের সাথে দৃঢ় সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর আলোকপাত করেন।
পল কাপুর বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও উৎসবমুখর সাধারণ নির্বাচনের জন্য উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারকে দায়িত্ব নেয়ার জন্য অভিনন্দন জানান। সেই সাথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে লেখা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিনন্দন পত্রের কথা উল্লেখ করেন এবং আগামী দিনে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক আরো শক্তিশালী হবে বলে আস্থা প্রকাশ করেন।
বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনার বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন এবং প্রাণহানি কমাতে, মধ্যপ্রাচ্য এবং তার বাইরে আরো অস্থিতিশীলতা রোধ করতে সংলাপ এবং কূটনৈতিক উপায়ে সঙ্ঘাতের দ্রুত সমাধানের আহ্বান জানান।
উভয় পক্ষ রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়েও আলোচনা করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের অব্যাহত মানবিক সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ধন্যবাদ জানান এবং সঙ্কটের টেকসই সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন কামনা করেন।
নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের সম্পৃক্ততা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপ আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে আরো গভীর করবে বলে উভয়পক্ষ আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
পল কাপুর আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে মতবিনিময় করবেন। সন্ধ্যায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে ইফতারে যোগ দেবেন।