খামেনির জানাজা উপলক্ষে জনসমুদ্র তেহরান

পশ্চিমাদের শক্ত বার্তা দিতে চায় ইরান

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে যুদ্ধের পর পশ্চিমাদের উদ্দেশে প্রতিরোধের বার্তা দিতে শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা শহীদ আলি খামেনির প্রায় সপ্তাহব্যাপী রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যানুষ্ঠনের সূচনায় তেহরানে লাখো মানুষের ঢল নেমেছে।

তেহরান থেকে এএফপির সংবাদদাতারা জানান, কালো পোশাক পরিহিত এবং শিয়া ইসলামে প্রতিশোধ ও ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত রক্তিম পতাকা হাতে শোকাহত মানুষ রাজধানী তেহরানের ধর্মীয় কমপ্লেক্স গ্র্যান্ড মোসাল্লায় সমবেত হন।

১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের নেতৃত্ব দেয়া আলি খামেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইলি হামলায় ৮৬ বছর বয়সে নিহত হন। ওই হামলায় তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য ও শীর্ষ কর্মকর্তারাও প্রাণ হারান। যুদ্ধে বেঁচে যাওয়া ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা শুক্রবার বিদেশী অতিথিদের অভ্যর্থনা জানান এবং তারা খামেনির কফিনে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে কমপ্লেক্সটি সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেয়া হয়।

তেহরানে আগামী কয়েক দিনে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। তাই শোকাহতদের স্বস্তি দিতে পানি ছিটানো হয়। নারী ও পুরুষকে পৃথকভাবে রাখা হয় এবং হাজারো মানুষ বিশাল কমপ্লেক্সটি পূর্ণ করে তোলেন।

এএফপির প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, সামনের মঞ্চে খামেনি ও তার পরিবারের আরো চার সদস্যের কফিন রাখা হয়েছে। অনুষ্ঠানস্থলে ‘আমেরিকার মৃত্যু হোক’ এবং ‘প্রতিশোধ, প্রতিশোধ’ স্লোগান ধ্বনিত হয়। ৩৮ বছর বয়সী ধর্মীয় নেতা মোহাম্মদ মিরসালেহি বলেন, ‘নেতা আমাদের সবার পিতার মতো ছিলেন। তার চলে যাওয়ায় আমরা সবাই এতিম হয়ে গেছি। তার মতো আর কেউ ছিলেন না। তিনি সত্যিই অনন্য ছিলেন।’ ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী হামিদরেজা শাবানি বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই উঠে দাঁড়াতে হবে এবং ইনশাআল্লাহ আমাদের নেতার রক্তের প্রতিশোধ নিতে হবে।’ কর্তৃপক্ষের ধারণা, রাজধানী তেহরানেই এসব কর্মসূচিতে এক কোটিরও বেশি মানুষ অংশ নেবেন।

তবে অনুষ্ঠান শুরুর আগে তেহরান ছিল তুলনামূলক শান্ত। সাধারণত যানজটে ভরা সড়কগুলো অনেকটাই ফাঁকা ছিল। প্যারিসে অবস্থানরত এএফপির সাংবাদিকদের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, জানাজার সময় তারা রাজধানী ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

পাঁচ সপ্তাহের যুদ্ধের পর যুদ্ধবিরতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি প্রাথমিক সমঝোতা কার্যকর থাকায় বর্তমানে সঙ্ঘাত স্থগিত রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই প্রয়োজন হলে আবার যুদ্ধ শুরু করার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে।

সাড়ে তিন দশকেরও বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা খামেনির মৃত্যু ইরানে নতুন এক যুগের সূচনা করেছে, যা অনিশ্চয়তায় আচ্ছন্ন। দেশটির কর্তৃপক্ষের মতে, এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সরকারের প্রতি জনসমর্থনেরও একটি পরীক্ষা। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভে হাজারো মানুষ নিহত হওয়ার অভিযোগে সরকার আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়ে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, খামেনির লাশ তিন দিন তেহরানে রাখা হবে। এরপর মঙ্গলবার ধর্মীয় নগরী কোমে নেয়া হবে। বুধবার লাশ নেয়া হবে প্রতিবেশী ইরাকে এবং বৃহস্পতিবার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় নিজ শহর মাশহাদে তার দাফন সম্পন্ন হবে। ইমাম খোমেনি মুসাল্লার মঞ্চে খামেনির কফিনের সাথে আরো চারটি কফিন রাখা হয়েছে। খামেনির কফিনের পাশাপাশি ২৮ ফেব্রুয়ারিতে একই হামলায় নিহত তার মেয়ে সাইয়্যেদা বুশরা হোসেইনি খামেনি, জামাতা মেসবাহ-উল-হুদা বাকেরি, পুত্রবধূ (বর্তমান সর্বোচ্চ নেতার স্ত্রী) জাহরা হাদ্দাদ আদেল এবং নাতনি জাহরা মোহাম্মাদি গোলপায়েগানির (১৪ মাস) লাশ রাখা হয়েছে।

মাশহাদে অবস্থিত ইমাম রেজার মাজার-এ তাকে সমাহিত করা হবে। একই কবরস্থানে তার নাতনি, জামাতা, কন্যা এবং মোজতবা খামেনির স্ত্রী জাহরা হাদ্দাদ আদেলকেও দাফন করা হবে। জীবিত থাকা শীর্ষ কর্মকর্তারা শুক্রবার প্রকাশ্যে শোক প্রকাশের পাশাপাশি ঐক্যের বার্তা দেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে শান্তি আলোচনায় ইরানের প্রধান আলোচক এবং পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফকে অশ্রুসজল দেখা যায়। একই সময়ে হামলায় নিহত পূর্বসূরির স্থলাভিষিক্ত হয়ে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস-এর প্রধান হওয়া আহমদ বাহিদি নতুন দায়িত্বে প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে উপস্থিত হন। গালিবাফ বলেন, ‘প্রতিশোধের জন্য জাতির আহ্বান সমগ্র বিশ্বের কানে পৌঁছাতে হবে।’ তিনি ইরানিদের ব্যাপক সংখ্যায় অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠান ঘিরে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বহু সড়ক বন্ধ রাখা হয়েছে এবং আকাশসীমাও বন্ধ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। ১৯৮৯ সালে রুহুল্লাহ খোমেনির দাফনের পর এটিই ইরানের সবচেয়ে বড় জনসমাগমের অনুষ্ঠান হতে যাচ্ছে। অতীতে এ ধরনের অনুষ্ঠানে পদদলিত হওয়ার ঘটনা ঘটায় এবার সে ঝুঁকি এড়াতে কর্তৃপক্ষ বিশেষ সতর্কতা নিয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনেও নিরাপদে অংশগ্রহণের নির্দেশনা প্রচার করা হচ্ছে।

শ্রদ্ধা জানাতে আসা ইরানিদের পরনে কালো পোশাক আর হাতে দেখা গেছে দেশটির লাল, সাদা ও সবুজ পতাকা, ‘বদ্ধ মুষ্টির’ প্রতীক, সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং বর্তমান মোজতবা খামেনির ছবি। তারা একদিকে প্রয়াত নেতাকে বিদায় জানাচ্ছেন, অন্যদিকে বর্তমান নেতার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করছেন।

সৌদি প্রতিনিধি, বাদশাহ ও যুবরাজের শোকবার্তা

ইরানকে আনুষ্ঠানিক শোকবার্তা পাঠিয়েছে সৌদি আরব। সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ এবং যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান যৌথভাবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের কাছে এই শোকবার্তা পাঠিয়েছেন। গতকাল শনিবার ভোরে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তেহরানে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় জানাজায় অংশ নিয়ে সৌদি আরবের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ আল-খেরেজি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের কাছে এই শোকবার্তাটি ব্যক্তিগতভাবে হস্তান্তর করেন। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে দীর্ঘদিনের বৈরী দুই দেশ- সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সাম্প্রতিক উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে সৌদি রাজপরিবারের এই উচ্চপর্যায়ের শোকবার্তা পাঠানো ভূরাজনৈতিকভাবে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। সৌদির প্রতিনিধিদের সূরা আলে ইমরানের ১৩ নম্বর আয়াত শোনানো হয়। খামেনিকে শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় যেসব বিদেশী এসেছেন তাদের সবাইকে পবিত্র কুরআন থেকে আলাদা আলাদা আয়াত তেলাওয়াত করে শুনিয়েছে ইরান। এর মধ্যে সৌদির প্রতিনিধিদের শোনানো হয়েছে সূরা আলে ইমরানের ১৩ নম্বর আয়াত। যেখানে ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধের কথা বলা হয়েছে। ওই যুদ্ধে আল্লাহর ওপর বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীদের মধ্যে লড়াই হয়। এই আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- তোমাদের জন্য অবশ্যই নিদর্শন আছে সেই দু’দল সৈন্যের মধ্যে যারা পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে দাঁড়িয়েছিল (বদর প্রান্তরে)। একদল আল্লাহর পথে যুদ্ধ করেছিল এবং অপর দল ছিল কাফির, কাফিররা মুসলিমদেরকে প্রকাশ্য চোখে দ্বিগুণ দেখছিল। আল্লাহ যাকে ইচ্ছে স্বীয় সাহায্যের দ্বারা শক্তিশালী করে থাকেন, নিশ্চয়ই এতে দৃষ্টিমানদের জন্য শিক্ষা রয়েছে।

সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, এই আয়াত শোনানোর মাধ্যমে ইরান সম্ভবত সৌদিকে বার্তা দেয়ার চেষ্টা করেছে তারা আল্লাহর পথে আছে। অপর দিকে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীরা কাফিরদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সৌদির প্রতিনিধিদের এ আয়াত শোনানোর বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ আলোচনা তৈরি করেছে।