এনসিপিতেই ফিরছেন মাহফুজ-আসিফ
চলছে পদ ও প্রার্থিতা নিয়ে আলোচনা
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ থেকে সদ্য পদত্যাগ করা ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম দুই প্রধান মুখ-মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পদত্যাগের পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে কোন ব্যানারে নির্বাচনে লড়বেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের এই দুই ‘পরিচিত মুখ’। বিএনপি, গণ অধিকার পরিষদ নাকি স্বতন্ত্র-নানা গুঞ্জন চাউর থাকলেও নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে শেষ পর্যন্ত নিজেদের ‘ঘর’ হিসেবে পরিচিত জাতীয় নাগরিক পার্টিতেই (এনসিপি) থিতু হতে যাচ্ছেন তারা।
ইতোমধ্যেই এনসিপির শীর্ষ নেতাদের সাথে মাহফুজ ও আসিফের কয়েক দফায় আলোচনা হয়েছে। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে জানানো হয়েছে, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই এই দুই নেতার এনসিপিতে যোগদানের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে। তবে যোগদানের আগে দলে নিজেদের পদমর্যাদা এবং সাংগঠনিক অবস্থান নিয়ে চলছে চূড়ান্ত পর্যায়ের দেনদরবার।
এনসিপিতে ‘ঘর’ গোছানো ও পদের সমীকরণ : গত ১০ ডিসেম্বর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন মাহফুজ ও আসিফ। সরকারের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে এবং নির্বাচনে সরাসরি অংশ নিতেই তাদের এই সরে দাঁড়ানো। এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে উপদেষ্টা পরিষদ ছেড়ে এনসিপির আহ্বায়কের দায়িত্ব নিয়েছিলেন আরেক ছাত্রনেতা নাহিদ ইসলাম। এখন মাহফুজ ও আসিফ দলে যোগ দিলে সাংগঠনিক কাঠামোতে বড় ধরনের রদবদলের সম্ভাবনা রয়েছে।
দলীয় একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, আসিফ মাহমুদ এনসিপিতে যোগ দেয়ার ক্ষেত্রে সাংগঠনিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদের নিশ্চয়তা চেয়েছেন। তিনি আহ্বায়কের ঠিক পরেই অর্থাৎ ‘সেকেন্ড-ইন-কমান্ড’ বা সমমর্যাদার কোনো পদ প্রত্যাশা করছেন। অন্যদিকে, অভ্যুত্থানের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতা হিসেবে পরিচিত মাহফুজ আলম সরাসরি সাংগঠনিক ক্ষমতার চর্চা না চাইলেও দলে সম্মানজনক এবং নীতিনির্ধারণী অবস্থানে থাকতে চান। মূলত এই পদবণ্টন এবং সাংগঠনিক ক্ষমতা কাঠামোর বিষয়টি সুরাহা করতেই আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় কিছুটা সময় লাগছে। এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম-আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব এ বিষয়ে বলেন, ‘শেখ হাসিনার পতন ঘটানো চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম দুই ছাত্রনেতা গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করে প্রতিষ্ঠিত দলে যোগ দেয়াটাই স্বাভাবিক।’
ঢাকা-১০ ও লক্ষ্মীপুর-১ আসন চূড়ান্ত : নির্বাচনী ময়দানে নামার বিষয়টি ইতোমধ্যেই স্পষ্ট করেছেন আসিফ মাহমুদ। গত ১২ ডিসেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি ঢাকা-১০ আসন (ধানমন্ডি, কলাবাগান, নিউমার্কেট ও হাজারীবাগ) থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দেন। তবে এনসিপিতে যোগদানের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে তিনি দলীয় প্রতীক ‘শাপলা কলি’ নিয়ে নির্বাচন করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, মাহফুজ আলম লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসন থেকে নির্বাচন করবেন বলে তার ঘনিষ্ঠ সূত্র নিশ্চিত করেছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এনসিপি সম্প্রতি ১২৫টি আসনে তাদের প্রাথমিক প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করলেও ঢাকা-১০ এবং লক্ষ্মীপুর-১ আসনে কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই দু’টি আসন মূলত আসিফ ও মাহফুজের জন্য আগে থেকেই ফাঁকা রাখা হয়েছে, যা তাদের এনসিপিতে যোগদানের বিষয়টিকে আরো জোরালো করে।
লক্ষ্মীপুর-১ আসনটি মাহফুজ আলমের নিজ এলাকা। তার ভাই মাহবুব আলম আগেই গণমাধ্যমে জানিয়েছিলেন যে মাহফুজ এই আসন থেকে নির্বাচন করবেন। যদিও মাহফুজ আলম ব্যক্তিগতভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়ার চেয়ে রাষ্ট্র সংস্কার ও বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে বেশি আগ্রহী ছিলেন, কিন্তু পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাকেও ভোটের মাঠে নামতে হচ্ছে।
অন্য দলে যোগদানের গুঞ্জন ও বাস্তবতা : পদত্যাগের পরপরই গুঞ্জন উঠেছিল যে আসিফ মাহমুদ ও মাহফুজ আলম বিএনপি বা গণ-অধিকার পরিষদে যোগ দিতে পারেন। বিশেষ করে পদত্যাগের আগের রাতে গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর ও সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খানের সাথে আসিফ মাহমুদের একটি বৈঠক এই গুঞ্জনকে উসকে দেয়। জানা গেছে, গণ অধিকার পরিষদের পক্ষ থেকে আসিফকে ঢাকা-১০ আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। তবে আসিফ সেই প্রস্তাবে সায় দেননি। সূত্র মতে, আসিফ সরাসরি বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করার বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন কিন্তু বিএনপির হাইকমান্ডের সাথে আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়ায় সেই সম্ভাবনা এখন ক্ষীণ। অন্যদিকে, মাহফুজ আলম শুরু থেকেই জামায়াতের সাথে নির্বাচনী সমঝোতার বিরোধী এবং তার নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন এনসিপির সাথেই বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
নির্বাচনী তফসিল ও নিরপেক্ষতার প্রশ্ন : গত ১১ ডিসেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন জাতির উদ্দেশে ভাষণে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। এর ঠিক আগেই সরকারের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া থেকে বাঁচাতে পদত্যাগ করেন দুই উপদেষ্টা। যদিও সরকারি একটি সূত্র জানায়, মাহফুজ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পদত্যাগ না করে সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত উপদেষ্টা হিসেবেই থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনকালীন সরকারের নিরপেক্ষতা এবং বিভিন্ন মহলের পরামর্শে তিনি পদত্যাগে সম্মত হন।
ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে ‘জেন-জি’ ফ্যাক্টর : এনসিপি নেতারা দাবি করছেন, গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেয়া শক্তি হিসেবে এই দলটিই তরুণ প্রজন্মের প্রকৃত রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। মাহফুজ ও আসিফের যোগদান দলটিকে সাংগঠনিকভাবে আরো শক্তিশালী করবে এবং ভোটারদের মধ্যে তরুণ নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াবে। এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, এনসিপি গণ-অভ্যুত্থানের দল। মাহফুজ-আসিফ এই অভ্যুত্থানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমরা আশা করছি, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই তারা আমাদের সাথে যুক্ত হবেন এবং আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নেবো।
এখন সবার দৃষ্টি আগামী কয়েক দিনের ঘটনাবলির ওপর। মাহফুজ ও আসিফ কি তাদের প্রত্যাশিত পদ পেয়ে এনসিপির পতাকাতলে সমবেত হবেন, নাকি শেষ মুহূর্তে স্বতন্ত্র হিসেবেই ভোটের লড়াইয়ে নামবেন- তা দেখার জন্য অপেক্ষা করছে রাজনৈতিক মহল। তবে এটা নিশ্চিত যে, জুলাই অভ্যুত্থানের নায়করা এখন ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে সংসদে নিজেদের অবস্থান পাকা করতে বদ্ধপরিকর।