জনমত তৈরির নীল নকশা

পাশ্চাত্যের রাজনীতিকদের মিথ্যাচার ও লাখো মানুষের প্রাণহানি

Printed Edition

মিডল ইস্ট মনিটর

আধুনিক যুগে যুদ্ধের ‘বিজয়’ প্রথম গুলি ছোড়ার অনেক আগেই নির্ধারিত হয়ে যায়। এটি তৈরি হয় জনমত গঠনের এক সুকৌশলী স্থাপত্যের ওপর ভিত্তি করে যেখানে রাজনৈতিক প্রতারণা এবং সংবাদমাধ্যমের সহায়তায় অবৈধ আগ্রাসনকে ‘নৈতিক প্রয়োজনীয়তা’ হিসেবে চালিয়ে দেয়া হয়। একটি চিরস্থায়ী যুদ্ধের অবস্থা বজায় রাখতে জনগণকে রণেেত্রর বীভৎসতা থেকে দূরে রাখা হয় এবং ক্রমাগত ‘আসন্ন হুমকি’ বা ‘মানবিক হস্তেেপর’ বুলি শোনানো হয়। ইরাকের সেই কাল্পনিক গণবিধ্বংসী অস্ত্র, আফগানিস্তানের ‘মুক্তিকামী’ আখ্যান কিংবা লিবিয়ার তথাকথিত ‘রার দায়িত্ব’- সব েেত্রই সংবাদমাধ্যম জনস্বার্থ রার বদলে রাষ্ট্রের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেছে। এর সূত্রটি সব সময় একই থাকে: পাশ্চাত্যের রাজনীতিকরা মিথ্যা বলেন, সংবাদমাধ্যম তা প্রচার করে এবং পরিণামে লাখো মানুষের প্রাণ যায়।

ইরাক : মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে একটি রাষ্ট্রের ধ্বংস

২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণ ছিল জনমত তৈরির এক নিখুঁত উদাহরণ। গণবিধ্বংসী অস্ত্রের ভয় এবং আল-কায়েদার সাথে বাগদাদের কাল্পনিক সম্পর্কের কথা বলে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রকে ধ্বংস করা হয়। কলিন পাওয়েল যখন জাতিসঙ্ঘে সাদা পাউডারভর্তি একটি শিশি প্রদর্শন করেন, পাশ্চাত্য সংবাদমাধ্যম তখন কোনো যাচাই ছাড়াই সেই গোয়েন্দা তথ্য প্রচার করে। বছরের পর বছর যখন সেই ভুলের জন্য মা চাওয়া হলো, ততণে একটি দেশ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।

লিবিয়া : ‘মানবিক’ হস্তেেপর চরম মূল্য

ইরাক যদি ভয়ের রাজনীতির উদাহরণ হয়, তবে ২০১১ সালের লিবিয়া ছিল নৈতিক কারসাজির দৃষ্টান্ত। এখানে ‘রার দায়িত্ব’ নামক একটি মহৎ তত্ত্বকে ভূরাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সংবাদমাধ্যম একটি জটিল গৃহযুদ্ধকে ‘গণতন্ত্রকামী বিদ্রোহী’ বনাম ‘রক্তপিপাসু স্বৈরশাসক’-এই দুই ভাগে ভাগ করে প্রচার শুরু করে। ফলাফল হিসেবে ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু এবং প্রায় ৫ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। ইরাকের মতোই লিবিয়াও এক বিভক্ত ও বিধ্বস্ত দেশে পরিণত হয়।

আফগানিস্তান : অদৃশ্য লাখো মানুষের প্রাণ

ইরাকের েেত্র ভুয়া প্রমাণের সাহায্য নেয়া হলেও আফগানিস্তানের েেত্র প্রমাণ ছাড়াই আক্রমণ চালানো হয়েছিল। এখানে মূল অস্ত্র ছিল ‘হয় আপনি আমাদের সাথে, না হয় আপনি সন্ত্রাসীদের সাথে- এই প্রচার। তালিবান যখন ওসামা বিন লাদেনকে কোনো তৃতীয় কোনো মুসলিম দেশে বিচারের জন্য হস্তান্তরের প্রস্তাব দিয়েছিল, বুশ প্রশাসন তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। সংবাদমাধ্যম একে ‘অবজ্ঞা’ হিসেবে প্রচার করে যুদ্ধের পরিবেশ তৈরি করে। ২০০১ সালের সেই হামলার ফলে দেড় লাখের বেশি মানুষ নিহত হন।

পরবর্তী ল্য : ইরান

বর্তমানে জনমত তৈরির এই একই নীল নকশা ইরানের েেত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। ইরাক যুদ্ধের প্রস্তুতির মতোই এখানেও একটি আঞ্চলিক শক্তিকে দানব হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। পাশ্চাত্য দর্শকদের আন্তর্জাতিক পারমাণবিক পর্যবেণের প্রযুক্তিগত দিক বা ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞার মানবিক বিপর্যয় সম্পর্কে অন্ধকারে রাখা হচ্ছে। ইরানকে একটি অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে প্রচার করার মাধ্যমে যখন প্রথম মিসাইল ছোড়া হবে, তখন সাধারণ মানুষ একে অনিবার্য বলে মনে করবে। ল্য সেই একই- মধ্যপ্রাচ্যের কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্র যেন আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করতে না পারে।

পাশ্চাত্য রাজনীতিকদের এই মিথ্যাচার কোনো আকস্মিক ভুল নয়, বরং এটি সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার একটি কাঠামোগত প্রক্রিয়া। রাজনীতিকরা মিথ্যা তৈরি করেন এবং সংবাদমাধ্যম তার জন্য জনমত গঠন করে, আর এর মূল্য দেয় গ্লোবাল সাউথ বা দণি বিশ্বের লাখো মানুষ।