শরিকদের বিজয় নিশ্চিতে বিশেষ কৌশল বিএনপির

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

সংশোধিত আরপিও এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রার্থী বিবেচনায় নির্বাচনে শরিকদের ‘বিজয় নিশ্চিতে’ বিশেষ কৌশল গ্রহণ করেছে বিএনপি। এর অংশ হিসেবে ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের ‘অনিবন্ধিত’ মিত্র দল ও জোটের শীর্ষ নেতা, যাদের বিএনপি মনোনয়ন দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাদের দলে যোগদান করিয়ে ‘ধানের শীষ’ নিশ্চিত করা হচ্ছে। অন্যদিকে নিবন্ধিত দলগুলোর শীর্ষ নেতারা, যাদের জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি রয়েছে, তাদের আসনও নিশ্চিত করা হয়েছে। দলীয় সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল হলেও জোটের ঐক্যের স্বার্থে তাদের এরই মধ্যে আশ্বস্ত করে ‘সবুজ সঙ্কেত’ দেয়া হয়েছে।

জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আসন সমঝোতা নিয়ে শরিকদের সাথে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শেষ করেছে বিএনপি। আজ-কালের মধ্যে অথবা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফেরার পরই মিত্রদের কে কোন আসনে নির্বাচন করবেন, তা ঘোষণা করা হবে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ প্রসঙ্গে বলেন, আসন সমঝোতা নিয়ে শরিকদের সাথে এরই মধ্যে আমাদের আলোচনা হয়েছে। আশা করছি, বিষয়টি দু-একদিনের মধ্যেই সুরাহা হয়ে যাবে। এটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে। শরিকদের সাথে কয়টি আসনে সমঝোতা হতে পারে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ জন্য আরেকটু অপেক্ষা করতে হবে। এখন কিছুই বলা যাবে না।’

নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফশিল অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে। আর নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন ২৯ ডিসেম্বর।

নির্বাচন সামনে রেখে এখন পর্যন্ত দুই দফায় মোট ২৭২ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থিতা ঘোষণা করেছে বিএনপি। এর ফলে ফাঁকা রয়েছে আর ২৮ আসন। বিএনপি থেকে বলা হয়েছে, এই ফাঁকা আসনগুলোতে মূলত শরিকরাই নির্বাচন করবেন। অবশ্য জোট নেতাদের অভিযোগ, বিএনপির চাওয়া অনুযায়ী দল ও জোটের প্রার্থী তালিকা জমা দিলেও কোনো আলোচনা ছাড়াই একতরফাভাবে প্রার্থিতা ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ছয়টি আসনে ‘অনিবন্ধিত’ দল ও জোটের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। তারা হলেন নড়াইল-২ আসনে জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের আহ্বায়ক ও এনপিপির চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, লক্ষ্মীপুর-১ আসনে ১২ দলীয় জোটের মুখপাত্র ও বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে ১২ দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা, কুষ্টিয়া-২ আসনে ১২ দলীয় জোট শরিক জাতীয় পার্টির (জাফর) মহাসচিব আহসান হাবিব লিংকন, যশোর-৫ আসনে জোট শরিক জমিয়তের যুগ্ম মহাসচিব রশিদ বিন ওয়াক্কাস এবং ঝালকাঠি-১ আসনে বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান।

এর মধ্যে গত ৮ ডিসেম্বর নিজ দল বাংলাদেশ এলডিপি বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগদান করেন শাহাদাত হোসেন সেলিম। তাকে লক্ষ্মীপুর-১ আসনে ধানের শীষের মনোনয়ন নিশ্চিত করেছে বিএনপি। এ ছাড়া গতকাল সোমবার নিজের দল বিলুপ্ত করে নেতাকর্মীদের নিয়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা। আসন্ন নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেবেন তিনি। অবশ্য এই আসনে এরই মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান ইকবালকে প্রার্থী করেছে বিএনপি। এখন এখানে প্রার্থিতায় পরিবর্তন এনে এহসানুল হুদাকে মনোনয়ন দিতে যাচ্ছে দলটি। এ দিকে ঝালকাঠি-১ আসনে ছাড় না পেয়ে বিএনপির সাথে এরই মধ্যে সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা দিয়েছেন লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান। যদিও একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইরান তৎকালীন ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে পিরোজপুর-২ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট করেছিলেন।

বিএনপি একাদশ সংসদ নির্বাচনে নড়াইল-২ আসনে তৎকালীন ২০ দলীয় জোট শরিক এনপিপির ফরিদুজ্জামান ফরহাদকে ধানের শীষ দিয়েছিল। এবার এখানে এরই মধ্যে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলামকে প্রার্থী করেছে দলটি। তবে গত বুধবার বিএনপির সাথে অনুষ্ঠিত বৈঠকে নড়াইল-২ আসনটি জোট প্রধান ফরিদুজ্জামান ফরহাদের জন্য পুনর্বিবেচনা করতে ঐক্যবদ্ধভাবে জোরালো অনুরোধ জানান সমমনা জোট নেতারা। তখন আসনটি (নড়াইল-২) পুনর্বিবেচনা করার ব্যাপারে জোট নেতাদের আশ্বস্ত করে বিএনপি। তবে ১২ দলীয় জোটের দুই শীর্ষ নেতার পর ফরিদুজ্জামান ফরহাদকেও বিএনপিতে যোগদান করতে বলা হবে, নাকি যুগপৎ জোটের প্রার্থী হিসেবে তাকে ধানের শীষ দেয়া হবে-সে ধোঁয়াশা এখনো কাটেনি।

জানতে চাইলে জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের আহ্বায়ক ও এনপিপির চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ বলেন, বিএনপির পক্ষ থেকে এরই মধ্যে সমমনা জোটকে আশ্বস্ত করে বলা হয়েছে- এনপিপির জন্য তারা একটি আসন বরাদ্দ করবে, আর যাদের মনোনয়ন দেয়া সম্ভব হবে না, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গেলে তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে।

জানা গেছে, ফাঁকা থাকা পিরোজপুর-১ আসনে ১২ দলীয় জোট প্রধান মোস্তফা জামাল হায়দারকে এরই মধ্যে আশ্বস্ত করে ‘সবুজ সংকেত’ দিয়েছে বিএনপি। এ ছাড়া গত বুধবার বিএনপির সাথে বৈঠকে কুষ্টিয়া-২ আসনটি জাতীয় পার্টির (জাফর) মহাসচিব আহসান হাবিব লিংকনের জন্য পুনর্বিবেচনা করতেও জোরালো দাবি জানায় ১২ দলীয় জোট। ২০১৮ সালে এই আসনে তৎকালীন ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট করেন লিংকন। বিএনপি এবার এই আসনে রাগীব রউফ চৌধুরীকে প্রার্থী করেছে।

‘আসন সমঝোতা’ নিয়ে গত বৃহস্পতিবার গণতন্ত্র মঞ্চভুক্ত পাঁচটি দলের সাথে আলাদাভাবে বৈঠক করে বিএনপি। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, মঞ্চের শীর্ষ তিন নেতা সমর্থন পেতে পারেন বিএনপির। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হককে ঢাকা-১২, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বগুড়া-২ এবং গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসন ছাড় দেয়া হতে পারে। এখন পর্যন্ত বগুড়া-২ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসন ফাঁকা থাকলেও ঢাকা-১২ আসনে প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। এখানে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরবকে প্রার্থী করেছে দলটি। সাইফুল হক প্রাথমিকভাবে ঢাকা-৮ আসন চাইলেও বিএনপি এখানে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসকে প্রার্থী করেছে। এখন ‘সমঝোতার অংশ হিসেবে’ সাইফুল হককে ঢাকা-১২ আসনে সমর্থন দিতে পারে বিএনপি। বৈঠকে তাকে এ ব্যাপারে আশ্বস্ত করা হয়েছে, এখন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়ার অপেক্ষা। আরপিও অনুযায়ী, মঞ্চের তিন শীর্ষ নেতা তাদের নিজ নিজ দলের প্রতীকে নির্বাচন করবেন।