যুদ্ধবিরতির মধ্যেও লেবাননে মুহুর্মুহু হামলা ইসরাইলের, নিহত ১৮

Printed Edition
onno-2
দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলের নতুন ‘নিরাপত্তা মানচিত্র’ : ইন্টারনেট

আলজাজিরা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্পাদিত নতুন সমঝোতা স্মারকে লেবাননের ওপর সব ধরনের সামরিক আক্রমণ বন্ধ করার স্পষ্ট আহ্বান জানানো সত্ত্বেও তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে দক্ষিণ লেবাননে অবিরাম বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইলি বাহিনী। ইসরাইলের এই সাম্প্রতিক ও ভয়াবহ হামলায় দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিহ জেলাজুড়ে নারী ও শিশুসহ অন্তত ১৮ জন নিহত হয়েছেন এবং আরো বেশ কিছু মানুষ আহত বা নিখোঁজ রয়েছেন।

গতকাল শুক্রবার লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এনএনএ এবং ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই পরিস্থিতির কথা জানানো হয়েছে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে এক বিবৃতিতে স্বীকার করেছে যে তারা গত রাতে দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য তীব্র বিমান ও স্থল হামলা পরিচালনা করেছে। তবে এই আগ্রাসনের পক্ষে যুক্তি দিয়ে তেলআবিব দাবি করেছে যে হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিকভাবে ঘোষিত ‘যুদ্ধবিরতির বারবার লঙ্ঘন’ করার সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবেই তারা এই পাল্টা সামরিক অভিযান চালাতে বাধ্য হয়েছে।

লেবাননের জাতীয় গণমাধ্যম এই নৈশকালীন বোমাবর্ষণকে ওই অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম তীব্র ও নৃশংস ইসরাইলি হামলা হিসেবে বর্ণনা করেছে, যেখানে মধ্যরাতের পর একের পর এক আবাসিক বাড়িঘরকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। লেবাননের জাতীয় বার্তা সংস্থা এনএনএ জানিয়েছে যে ইসরাইলি ভারী কামান ও গোলন্দাজ বাহিনী প্রথমে নাবাতিহ শহর, কাফার জুজ এবং এর আশপাশের বেশ কয়েকটি সীমান্ত শহর যেমন কাফার রেমান ও জেবদিনে ব্যাপক গোলাবর্ষণ করে।

এর পরপরই ইসরাইলি যুদ্ধবিমানগুলো কাফার তিবনিত এবং রায়হান পাহাড়ের ওপর একের পর এক শক্তিশালী বিমান হামলা চালায়। এই রক্তক্ষয়ী হামলায় কেবল নাবাতিহ শহর এবং হারুফ এলাকাতেই অন্তত আটজন সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন। এর পাশাপাশি আল-শারকিয়া ও দুয়ের অঞ্চলের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত একটি আবাসিক বাড়ি লক্ষ্য করে চালানো ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একই পরিবারের চারজন নিহত হন এবং কাফার সির নামক প্রত্যন্ত শহরে আরেকটি হামলায় আরো তিনজন প্রাণ হারান।

৪ ইসরাইলি সেনা নিহত, তীব্র হামলার হুমকি দুই মন্ত্রীর

আলজাজিরা আরো জানায়, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে চলমান তীব্র সঙ্ঘাতের মাঝে চার ইসরাইলি সেনা নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে লেবাননে কঠোর ও ধ্বংসাত্মক প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেয়ার হুমকি দিয়েছেন ইসরাইলের দুই উগ্র ডানপন্থী মন্ত্রী।

গতকাল শুক্রবার ইসরাইলি সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে দক্ষিণ লেবাননে যুদ্ধে তাদের চার সেনার নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে প্রকাশিত এক বার্তায় তারা নিহতদের মধ্যে ৫২তম ব্যাটালিয়ন ও ৪১তম ব্রিগেডের কমান্ডার দর গেদালিয়া বেন সিমহোনের (৩২) পরিচয় প্রকাশ করেছে। সেনা নিহতের এ ঘটনায় ইসরাইলের উগ্র ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেনগভির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) তীব্র ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে লিখেছেন, মার্কিন নাগরিকদের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই বলছি, ইসরাইলের উচিত পুরো বিশ্বকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়া, আমাদের সন্তানদের রক্ত এবং আমাদের নাগরিকদের নিরাপত্তা কোনোভাবেই বিসর্জন দেয়া যাবে না। পুরো লেবাননকে পুড়তে হবে।

নিজের বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য পরিচিত এই মন্ত্রী আরো জানান, তিনি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে ব্যক্তিগত বৈঠকেও বলেছেন যে, একজন ইসরাইলি মায়ের প্রতিটি অশ্রুর জন্য এক হাজার লেবাননি মায়ের কাঁদতে হবে। একই ঘটনায় ইসরাইলের আরেক উগ্রপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ এক্সে দেয়া এক পোস্টে চার সেনা নিহতের ঘটনাকে ‘একটি কঠিন সকাল’ বলে অভিহিত করেছেন। আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত এই মন্ত্রী লেবাননের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘এখন আগুনের ভাষায় কথা বলার সময়। নরকের দরজা খুলে দেয়ার সময়।’

দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলের নতুন ‘নিরাপত্তা মানচিত্র’

এ দিকে রয়টার্স জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পরও দক্ষিণ লেবাননে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’-এর একটি নতুন ও সম্প্রসারিত মানচিত্র প্রকাশ করেছে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। একই সাথে ইসরাইল সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারা আপাতত এই অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না এবং এর বাইরেও নতুন করে হামলা চালানোর সম্ভাবনা নাকচ করছে না।

রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, নতুন মানচিত্রে ইসরাইল সীমান্ত থেকে লেবাননের ভূখণ্ডের ভেতরে পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রায় ১০ কিলোমিটার (৬ মাইল) গভীর পর্যন্ত এলাকাকে ইসরাইলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। লাল রঙে চিহ্নিত এই নতুন অঞ্চলটি গত এপ্রিল মাসের ‘ফরওয়ার্ড ডিফেন্স লাইন’ বা বাফার জোনের চেয়েও অনেক বেশি গভীরে বিস্তৃত। আগের বাফার জোনটি সীমান্ত বরাবর লিটানি নদী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, যার মধ্যে লেবাননের প্রায় ৫২টি গ্রাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। নতুন এই মানচিত্রে ইসরাইল তাদের ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ লেবাননের ভেতরের দিকে আরো কয়েক কিলোমিটার সম্প্রসারিত করেছে। এমনকি লিটানি নদীর উত্তরে অবস্থিত হিজবুল্লাহর শক্তিশালী ঘাঁটি নাবাতেহর কাছের কিছু এলাকাকেও নিজেদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল হিসেবে দেখিয়েছে। ইসরাইলি সেনারা ইতোমধ্যে ওই সব এলাকায় প্রবেশ করে অভিযান চালাচ্ছে।