শোকজের পরদিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৩ কর্মকর্তা ঢাকার বাইরে বদলি

গভর্নরকে ‘স্বৈরাচার’ আখ্যা

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরকে ‘স্বৈরাচার’ আখ্যা দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করার ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তিন কর্মকর্তাকে শোকজ করার পরদিনই ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগ থেকে জারি করা এক আদেশে এই বদলি কার্যকর করা হয়।

বদলীকৃত কর্মকর্তারা হলেন-বাংলাদেশ ব্যাংকের নীল দলের সাধারণ সম্পাদক ও এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগের পরিচালক নওশাদ মোস্তফা, বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি এ কে এম মাসুম বিল্লাহ ও একই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা শ্রাবণ। আদেশ অনুযায়ী নওশাদ মোস্তফাকে প্রধান কার্যালয় থেকে বরিশাল অফিসে, মাসুম বিল্লাহকে রংপুর অফিসে, গোলাম মোস্তফা শ্রাবণকে বগুড়া অফিসে বদলি করা হয়েছে।

শোকজ ও শাস্তির হুঁশিয়ারি : বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, তিন কর্মকর্তাকে শোকজ করা হয়েছে এবং ১০ দিনের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে। জবাব সন্তোষজনক না হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, ‘পত্র-পত্রিকায় যাদের নাম এসেছে, তারাই শোকজের তালিকায় রয়েছেন।’ সংবাদ সম্মেলন করার এখতিয়ার ছিল কি না- এ প্রশ্নে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।

কেন এই ব্যবস্থা : সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স কাউন্সিলের পক্ষে সর্বদলীয় কমিটির ব্যানারে আয়োজিত এক আকস্মিক সংবাদ সম্মেলনে এই তিন কর্মকর্তা গভর্নরের বিভিন্ন নীতির কড়া সমালোচনা করেন। এক পর্যায়ে গভর্নরের কর্মকাণ্ডকে স্বৈরাচারীর কর্মকাণ্ড হিসেবে আখ্যায়িত করেন। সমালোচনার মূল বিষয়গুলো ছিল- দুর্বল ব্যাংকের সাথে এক্সিম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ, ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার প্রক্রিয়া ও ব্যাংক রেজুলিউশন নীতির স্বচ্ছতা।

কর্মকর্তাদের বক্তব্য : সংবাদ সম্মেলনে এ কে এম মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘আমরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন চাই, তবে তা প্রতিষ্ঠানের জন্য; ব্যক্তির জন্য নয়।’ গোলাম মোস্তফা শ্রাবণ দাবি করেন, গভর্নরের ‘খেয়ালিপূর্ণ’ বক্তব্য বন্ধ করে বস্তুনিষ্ঠ প্রক্রিয়ায় ব্যাংক রেজুলিউশন নিশ্চিত করতে হবে। নওশাদ মোস্তফা বলেন, ‘৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান না ঘটলে হয়তো আমরা এতটা খোলামেলাভাবে কথা বলতাম না।’ কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, স্বৈরাচার হাসিনার দেড় দশকের বেশি সময়ে ব্যাংক খাতের লুটপাট নিয়ে এসব কর্মকর্তা কখনো মুখ খোলেননি। দেশের প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকগুলো দখল করে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণের নামে বিদেশে পাচার করেছে। কিছু ব্যাংক ফাঁপা করে দিয়েছে লুটেরা। ওই সব ব্যাংক এখন গ্রাহকের টাকা দিতে পারছে না। এসব বিষয় নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথাকথিত নেতারা মুখে কুলুপ এঁটে ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে পতিত আওয়ামী লীগের বিদায় নেয়ার পর বর্তমান গভর্নর লুটেরাদের টুঁটি চেপে ধরেছেন। ব্যাংকগুলোর পর্ষদ ভেঙে দিয়েছেন। ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছেন। পাচারকারীদের সম্পদ বাজেয়াপ্তকরাসহ পাচারের অর্থ ফেরত আনতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। নেয়া হয়েছে ব্যাংক সংস্কার কর্মসূচি, যা নির্বাচিত সরকারও অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে।

স্টাফ রেগুলেশনের প্রশ্ন : বাংলাদেশ ব্যাংকের স্টাফ রেগুলেশন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদেরকে সংবাদ সম্মেলন বা প্রকাশ্য বক্তব্যের আগে গভর্নরের অনুমোদন নিতে হয়। কোনো ধরনের আপত্তি থাকলে তা অভ্যন্তরীণ ফোরামে তোলার বিধান রয়েছে। কিন্তু সংবাদ সম্মেলন ডেকে এই নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি বলে প্রশাসন মনে করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন নীতিনির্ধারক জানিয়েছেন, নির্বাচিত সরকার গঠিত হওয়ার পরপরই ব্যাংক লুটেরাদের উসকানিতে গভর্নরের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অপপ্রচার শুরু করেছে কিছু কর্মকর্তা। আর এরই ধারাবাহিকতায় ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ্যে সংবাদ সম্মেলন করে গভর্নরকে স্বৈরাচার হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি শৃঙ্খলা লঙ্ঘন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তাদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক হলো ব্যাংক খাতের অভিভাবক। বাংলাদেশ ব্যাংকেই শৃঙ্খলা ভঙ্গ হলে ব্যাংকিং খাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত পরিপালনে প্রশ্ন দেখা দেয়। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর অবস্থানে না থাকলে পুরো ব্যাংকিং খাতেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।