লুকানো টাকা ব্যাংকে ফেরায় কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে : অর্থ উপদেষ্টা
১২টি সোলার বিদ্যুৎ প্রকল্প অনুমোদন
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
লুকিয়ে রাখা টাকা ব্যাংকে ফিরে আসার কারণে দেশে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে বলে মনে করেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।
গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে সচিবালয়ে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি এ তথ্য জানান।
সাংবাদিকরা তাকে প্রশ্ন করেন, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্যাংকে এখন কোটিপতির সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। এখন প্রশ্ন হলো- দেশে তো এখন কোনো রাজনৈতিক সরকার নেই। এখন তো দুর্নীতিও হয় না, দেশে কর্মসংস্থান নেই, বিনিয়োগ নেই, সেখানে কোটি কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব কেন বাড়ে-এর জবাবে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘এটা আমি জানি না, তবে এটি হতে পারে অনেকে বাড়ির ভেতর (টাকা) লুকিয়ে রেখেছিল, এখন ব্যাংকে তা জমা রাখছে। ব্যাংকের ওপর কনফিডেন্ট হয়েছে। টাকা-পয়সা যে নাই তা বলা যাবে না।
এ দিকে গত রোববার প্রকাশিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতে কোটিপতি গ্রাহকের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিকের তুলনায় জুন প্রান্তিকে এ হিসাব সংখ্যা বেড়েছিল ৫ হাজার ৯৭৪টি। জুন থেকে সেপ্টেম্বর এই তিন মাসে আরো ৭৩৪টি কোটিপতি অ্যাকাউন্ট সংখ্যা বেড়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবশেষ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, জুন শেষে ব্যাংক খাতে মোট হিসাব (অ্যাকাউন্ট) ছিল ১৬ কোটি ৯০ লাখ ২ হাজার ৬৭১টি। সেপ্টেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ কোটি ৪৫ লাখ ৯৬ হাজার ৭০০টিতে। অর্থাৎ তিন মাসে নতুন হিসাব খোলা হয়েছে ৫৫ লাখ ৯৪ হাজার ২৯টি।
একই সময়ে ব্যাংকে আমানতও কিছুটা বেড়েছে। জুন শেষে আমানতের পরিমাণ ছিল ১৯ লাখ ৯৬ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর শেষে তা দাঁড়ায় ২০ লাখ ৩১ হাজার ১১৯ কোটি টাকা। ফলে তিন মাসে আমানত বেড়েছে ৩৪ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, ১৯৭২ সালে দেশে কোটিপতি আমানতকারী ছিল মাত্র পাঁচজন। এরপর ১৯৭৫ সালে ৪৭ জন, ১৯৮০ সালে ৯৮টি হিসাব, ১৯৯০ সালে ৯৪৩টি, ১৯৯৬ সালে ২ হাজার ৫৯৪টি কোটিপতি হিসাব বা অ্যাকাউন্ট ছিল। এরপর ২০০১ সালে ৫ হাজার ১৬২টি, ২০০৬ সালে ৮ হাজার ৮৮৭টি ও ২০০৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৯ হাজার ১৬৩টিতে।
যেসব বিষয়ে অনুমোদিত
গতকালের ক্রয়সংক্রান্ত বৈঠকের বিষয়ে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, বৈঠকে ২৮টি অ্যাজেন্ডা ছিল। মূলত চাল আমদানি এবং ডিএপি সার, এওপি সার আমদানির অনুমতি দিয়েছি। আমরা চাই এগুলো যেন কোনো ঘাটতি না থাকে। তিনি দাবি করেন, এবার ফসলের উৎপাদন ভালো হয়েছে। এখন ডিপেন্ড করে বাজারে অন্যেরা কী করবে। মসুর ডাল আমদানি অনুমতি দিয়েছি। রোজার আগে এই পণ্যগুলো যাতে ঠিক থাকে। খেজুরের বিষয়ে পরে একটি ব্যবস্থা নেবো। ১২টি সোলার বিদ্যুৎ প্রকল্প অনুমতি দিয়েছি। একটি কম্বাইন্ড বিদ্যুৎ প্রকল্প অনুমতি দিয়েছি। এলএনজি ও পাঠ্যপুস্তুক সব অনুমতি দিয়েছি। অর্থ উপদেষ্টা বলেন, সরকার প্রথম শ্রেণী থেকে নবম শ্রেণী পর্যন্ত মুলতবি থাকা সব পাঠ্যবই-সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদন করায় নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে পাঠ্যবই ছাপানো ও বিতরণ কার্যক্রমে বড় ধরনের কোনো বিঘœ ঘটবে না।
তিনি বলেন, যে বইগুলো পেন্ডিং ছিল, সেগুলোর জন্য আমরা পুনঃটেন্ডার চেয়েছিলাম। আগের সব অনুমোদনও নিষ্পত্তি হয়েছে। আমরা আশা করছি সময়মতো বই পাওয়া যাবে। সামান্য কিছু দেরি হতে পারে। তবে বড় ধরনের বিঘœ ঘটার কথা নয়। ঠিক কতদিন দেরি হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে ড. সালেহউদ্দিন কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানাননি। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, সরকার জানুয়ারির মধ্যেই লক্ষ্য পূরণে কাজ করছে। তিনি বলেন, আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আমাদের লক্ষ্য জানুয়ারির মধ্যেই সবার হাতে বই পৌঁছে দেয়া। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সময় মতো পাঠ্যবই বিতরণে কোনো ধরনের প্রভাব ফেলবে কি না এমন প্রশ্নে উপদেষ্টা এ উদ্বেগকে ‘ভ্রান্ত ধারণা’ আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, নির্বাচনের সাথে বইয়ের কী সম্পর্ক? নির্বাচন তো বলবে না ‘বই বিতরণ করো না’। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলে কিছু প্রশাসনিক কার্যক্রমে বিধিনিষেধ আসে, কিন্তু শিক্ষাসামগ্রী তার মধ্যে পড়ে না। বরং আমরা সময়মতো বই বিতরণে উৎসাহ দেবো। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, আগের বছরগুলোতেও জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) দেরিতে বই পৌঁছে দিলেও বিদ্যালয়ের শিক্ষাকার্যক্রম চালু ছিল। ড. সালেহউদ্দিন বলেন, শিশুরা জানুয়ারিতেই স্কুলে যায়। এক সপ্তাহ দেরি হলেও ছাত্ররা বই পেয়ে যাবে। আমরাও স্কুলজীবনে দেরিতে বই পেতাম। পাঠ্যবই বিতরণ নিশ্চিত করা অন্তর্বর্তী সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তিনি বলেন, গুণগত মান ও সময়মতো বই সরবরাহ নিশ্চিত থাকবে। আমরা পুরো প্রক্রিয়া নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। ড. সালেহউদ্দিন আরো স্পষ্ট করে বলেন, নির্বাচন সরকার পরিচালনা বন্ধ করে দেয় না।
তিনি বলেন, অনেকে মনে করেন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলেই সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়; এটা সত্য নয়। শুধু যেসব কার্যক্রম সরাসরি নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে, যেমন মাঠপর্যায়ের বদলি বা সংবেদনশীল বরাদ্দ, তাতে নিষেধাজ্ঞা থাকে। বাজেট কার্যক্রম, বেতন-ভাতা, চলমান প্রকল্প, ক্রয়-বিক্রয় ও অনুমোদন প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবে চলতে থাকে। নির্বাচনের আগে কোনো নতুন অধ্যাদেশ জারির পরিকল্পনা আছে কি না এ প্রশ্নে উপদেষ্টা জানান, বর্তমানে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেই। তিনি আরো বলেন, ব্যাংকিং রেজুলেশন ইতোমধ্যে পাস হয়েছে, নন-ব্যাংকিং ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন আইনও পাস হয়েছে, এনবিআর সংস্কার প্রায় শেষ। শুধু জনবল সংক্রান্ত কিছু বিষয় রয়েছে, যার সাথে নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই।